'তামিল রকার্স' এর উৎপত্তির সূত্র কোথায়? এই চক্রের কলকাঠি কারা নাড়ে? সিনেমাগুলোও বা লিক কিভাবে হয়? এবং সাইটে সিনেমাগুলো যেহেতু ফ্রি'তেই ডাউনলোড করা যায়, তাহলে এখান থেকে তামিল রকার্সের লাভও বা কী? এরা এরকম রেকলেসও বা কেন? কেন প্রশাসন এদের টিকিটিও ছুঁতে পারেনি এখনো?

যারা মোটামুটি সিনেমা-টিনেমা দেখেন, তাদের প্রায় সবারই 'তামিল রকার্স' নামের টরেন্ট সাইটকে চিনে থাকবার কথা। পাইরেটেড মুভির বিশাল বড় কালেকশন নিয়ে যাদের বিচরণ বহুদিন ধরেই৷ সেই 'তামিল রকার্স' একবার ঘোষণা দিলো- তামিলের এক সুপারস্টারের বিগ বাজেট মুভি (৩০০ কোটি টাকা বাজেট) রিলিজের এক দিন আগেই তারা এইচডি প্রিন্টে ছেড়ে দেবেন অনলাইনে। বলা বাহুল্য, সিনেমা-সংক্রান্ত মানুষজনের তখন শিরে সংক্রান্তি। তারা দ্বারস্থ হলেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। পুলিশের একাধিক ইউনিট, সাইবার সেল নেমে পড়লো অনুসন্ধানে। কারা এই 'তামিল রকার্স' এর পালের গোদা, তা খুঁজে বের করার জন্যে শুরু হলো চিরুনি তল্লাশি। শুরু হলো অন্যরকম এক থ্রিলারের গল্প।

স্ট্রিমিং সাইট 'সনি লিভ' এ আসা এরকমই এক ইন্টারেস্টিং প্লটের ওয়েব সিরিজ 'তামিল রকার্স' দেখে প্রথমেই মনে এলো- ওয়েব সিরিজের এই টাইটেল দেখেই হুকড হবে বহু মানুষ। আর আট পর্বের এই সিরিজকে সাজানোও হয়েছে এমনভাবে, সেখানে থ্রিল কিংবা সাসপেন্সের একাধিক অনুষঙ্গ যেমন আছে, তেমনি আছে তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির খুঁটিনাটি অনেক ডিটেইলসও। আছে 'তামিল রকার্স' এর উৎপত্তির কিছু তথ্যও৷ তারা কিভাবে অপারেট করে, কিভাবে বিজনেস করে, সেসবের বর্ণনাও৷ সব মিলিয়েই তাই এই কন্টেন্ট জমজমাট এক পটবয়লার। 

যদিও এই ওয়েব সিরিজের গল্পটা ফিকশনাল, কিন্তু যে 'তামিল রকার্স'কে কেন্দ্র করে এই কন্টেন্ট, তারা যে মোটেও কল্পকথা না, তাও সবারই জানা। মুক্তির আগেই বহু সিনেমা অনলাইনে রিলিজ করে তারা যেভাবে সর্বস্বান্ত করেছে বহু মানুষকে, সর্বজনবিদিত সেটিও। উদাহরণ হিসেবে থালাপতি বিজয়ের 'সরকার' সিনেমার কথাই বলা যেতে পারে। এই সিনেমা মুক্তির আগে 'তামিল রকার্স' তাদের এক আনভেরিফাইড টুইটার অ্যাকাউন্টে ঘোষণা দিয়েছিলো- 'সরকার' সিনেমাহলে আসার একদিন আগেই তারা সিনেমার এইচডি প্রিন্ট অনলাইনে রিলিজ করবে। যদিও পরে 'তামিল রকার্স' এই টুইটার অ্যাকাউন্টের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে। টুইটার অ্যাকাউন্টটিকে সাসপেন্ডও করা হয়। কিন্তু, তবুও দেখা যায়- সিনেমাটা মুক্তির কয়েক ঘন্টা পরেই অনলাইনে ছেড়ে দিয়েছে 'তামিল রকার্স। সেসময়ে বেশ ঝড়ও উঠেছিলো এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। 'তামিল রকার্স'কে উচ্ছেদ করার জন্যে উঠেপড়েও লেগেছিলো একাধিক মহল। যদিও শেষপর্যন্ত কুটোটিও নড়েনি। এই টরেন্ট সাইটও রয়ে গিয়েছে বহাল তবিয়তে। 

লেখার এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠতে পারে, 'তামিল রকার্স' এর উৎপত্তির সূত্র কোথায়? এই চক্রের কলকাঠি কারা নাড়ে? সিনেমাগুলোও বা লিক কিভাবে হয়? এবং সাইট থেকে সিনেমাগুলো যেহেতু ফ্রি'তেই ডাউনলোড করা যায়, তাহলে এখান থেকে তামিল রকার্সের লাভও বা কী? সব প্রশ্নের উত্তরই মূলত এই ওয়েব সিরিজে আছে। যদিও গল্পের প্রয়োজনে খানিকটা রঙও চড়ানো হয়েছে। এবং সেটা স্বাভাবিকও। তাই, রংটুকু সরিয়ে মূল ঘটনায় যদি আলোকপাত করা হয়, জানা যাবে- 'তামিল রকার্স' এর যাত্রা শুরু ২০১১ সালের দিকে। যদিও তাদের নেটওয়ার্কে জড়িত বহু মানুষ, কিন্তু মূল হোতা হিসেবে কয়েকজন বন্ধুই জড়িত এই পাইরেসি র‍্যাকেটের সাথে। এখানে আরেকটা বিষয় জানিয়ে রাখা দরকার- 'তামিল রকার্স' যাত্রা শুরু করার আগে আরো ২-৩টি ওয়েবসাইট ছিলো, যারা এভাবে সিনেমা লিক করে অনলাইনে ছেড়ে দিতো। তবে এসব ওয়েবসাইটের মূল ব্যবসা হতো মূলত পাইরেটেড সিডি/ডিভিডি বিক্রি করে। এরকম বহু দৃষ্টান্ত আছে, যেখানে মূল সিনেমার অফিশিয়াল ভার্সনে যে ক'টি ডিভিডি বিক্রি হয়েছে, তার চেয়ে ঢেরগুণ বেশি বিক্রি হয়েছে আন-অফিশিয়াল পাইরেটেড ভার্সনে। কারণ, কম মূল্য। আর সহজলভ্যতা। 

স্বভাবতই, সিনেমা-সংশ্লিষ্ট মানুষেরা 'পাইরেটেড ডিভিডি'র এই দৌরাত্মে বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিলেন। ফলশ্রুতিতে, এই বিক্ষুব্ধ মানুষেরা একবার তামিলনাড়ুর বেশ কিছু পাইরেটেড ডিভিডি'র দোকানে ভাংচুর করেন৷ যাদের জীবিকা ছিলো এভাবে ডিভিডি বিক্রি করে সংসার চালানো, এই ভাংচুরে সেরকম বেশ কিছু ব্যবসায়ীর ব্যবসা লাটে ওঠে। বেশ ক্ষতির মুখোমুখিও হয় তারা। এরকম কয়েকজন বন্ধু, যাদের ডিভিডি'র দোকান ভাংচুর করে ধূলিসাৎ করা হয়েছে, তারা সিদ্ধান্ত নেয়- এবার অনলাইনে মুভি পাইরেসি করবে তারা। সেখান থেকেই মুলত আসে 'তামিল রকার্স' এর আইডিয়া।

পাইরেটেড ডিভিডি বিক্রি থেকেই আসে 'তামিল রকার্স' এর আইডিয়া

এবার পরবর্তী প্রশ্ন- সিনেমাগুলোর এই পাইরেসির যে র‍্যাকেট, সে র‍্যাকেটে জড়িত মূলত কারা? এবং এখানেই আছে বড়সড় এক চমক। জেনে অবাক হবেন- 'তামিল রকার্স' এর এই র‍্যাকেটে বহু মানুষের পাশাপাশি জড়িত সিনেমা হলের কলাকুশলীরাও। কিছুক্ষেত্রে জড়িত সিনেমার প্রোডিউসার-ডিস্ট্রিবিউটররাও। সিনেমার প্রোডিউসার-ডিস্ট্রিবিউটররা মূলত নিজের সিনেমার হাইপ বাড়ানো এবং রাইভাল সিনেমাকে ডাউন করার জন্যেই মাঝেসাঝে যুক্ত হতেন 'তামিল রকার্স' এর র‍্যাকেটের সাথে। যে সংস্কৃতি চালু আছে এখনও! 

তবে এরা ছাড়াও 'তামিল রকার্স' এর এই সিনেমা লিকের অপারেশন হয় তিন পদ্ধতিতে। প্রথমত- ফিল্ম স্টুডিও স্টাফের মাধ্যমে। কোনো সিনেমা মুক্তির আগে যখন প্রিমিয়ার হয়, তখন মূলত এই স্টাফেরা সে সিনেমাকে রেকর্ড করে। এরপর মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রেকর্ডেড সিনেমা তারা 'তামিল রকার্স' এর হাতে তুলে দেয়। দ্বিতীয়ত- সিনেমাহলের মালিকদের মাধ্যমে। এরা সিনেমাহলে পুরো সিনেমাকে ক্যামেরায় রেকর্ড করে এরপর 'তামিল রকার্স'কে সরবরাহ করে। তৃতীয়ত- কন্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে। এই কন্ট্রিবিউটরেরা সিনেমা দেখার সময়ে লুকিয়ে রেকর্ড করে এরপর সেই রেকর্ডেড কপি ট্রান্সফার করে 'তামিল রকার্স' এর কাছে। এই যে তিন লেয়ার, এদের মাধ্যমেই মূলত সিনেমাগুলো লিক হয়ে এসেছে বরাবর। 

'তামিল রকার্স' তিন পদ্ধতিতে করে মুভি সংগ্রহের কাজ

এবার আসা যাক শেষ প্রশ্নে। 'তামিল রকার্স' ওয়েবসাইটে তো সিনেমা ফ্রি'তেই পাওয়া যায়। তাহলে এখান থেকে 'তামিল রকার্স' এর প্রফিট কী? মূলত, যে ওয়েবসাইটে সিনেমাটা তারা আপলোড করছে, সেই ওয়েবসাইটের অ্যাড এবং পপ আপ থেকে তারা মোটা অঙ্কের টাকা পায়৷ এবং এখানেই শেষ না৷ অনেক সময় তারা কোনো সিনেমার প্রোডিউসারকে বাধ্য করে তাদেরকে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে৷ যদি টাকা না দেয়া হয়, তাহলে তারা সেই প্রোডিউসারের সিনেমা অনলাইনে ছেড়ে দেবে বলেও হুমকি দেয়। যদি হুমকি শুনে সেই প্রোডিউসার টাকা দেয়, তাহলে তো হলোই। কিন্তু, যদি সে প্রোডিউসার টাকা না দেয়, তাহলে সিনেমা লিক করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বড় হোস্টিং সাইটে তারা সেল করেও অর্থ উপার্জন করে।  

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- 'তামিল রকার্স' ওয়েব সিরিজে এই বিষয়গুলো খুব ডিটেইলড ফোকাসেই দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি, এ ওয়েব সিরিজ 'কলিউড' এর সিনেমার যে সিনারিও, সেটাও খুব স্পষ্ট ন্যারেশনে পোর্ট্রে করেছে। যেমন- হিরোর সিনেমার ডিসিশন যে অনেকক্ষেত্রে নেয় তার বাবা, এমনকি সিনেমায় কোন সিন থাকবে আর কোন সিন থাকবে না... সে সিদ্ধান্ত নেয়ার মত ঔদ্ধত্যও যে তারাই দেখায়, প্রোডিউসার'রা 'সিনেমা'কে যে আলু-পটলের ব্যবসার মতই মনে করে, ডিরেক্টরের মতামত যে অনেকক্ষেত্রেই থাকে ব্রাত্য.. এসব খুব ভালোভাবেই স্পষ্ট হয় এ ওয়েব সিরিজে৷ সে সাথে, তামিল সুপারস্টারদের ফ্যানদের যে রাইভারলি, এক হিরোর ফ্যানবেজ যে আরেক হিরোর ফ্যানবেজ'কে ন্যূনতম গ্রাহ্যও করেনা, এবং প্রত্যেক স্টাররাই তাদের ফ্যানবেজ'কে যে দারুণভাবে প্যাট্রোনাইজ করে, সেটাও খুব ভালোভাবে উঠে আসে ন্যারেশনের নানা অংশে৷ 

তামিল হিরোদের ফ্যানবেইজ বরাবরই ফ্যানাটিক

'তামিল রকার্স' ওয়েব সিরিজটি ফ্যাক্ট এবং ফিকশনের ফিউশনে তাই বেশ ভালো এক নির্মাণ। যদিও চাইলে কিছু অংশ কাটছাঁট করা যেতে পারতো, রানটাইমও চাইলে কমানো হয়তো যেতো।  তবে সেসব না করলেও পুরো সিরিজ বেশ ইন্টারেস্টিং। 'তামিল রকার্স' এর হাঁড়ির খবর যেমন এখানে আছে, আছে কলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সাত-সতেরোও। যদিও, সত্যি এটাই, 'তামিল রকার্স' কিংবা এদের শাখাপ্রশাখা'কে নিয়ন্ত্রণ করা যাবেনা কোনোদিনই, কিন্তু এদের যে বিচিত্র সব ট্রিভিয়া, একদল দুর্ধর্ষ মুভি-সন্ত্রাসী'র যে রোমহষর্ক অ্যাডভেঞ্চার... মূলত সেটুকু জানার জন্যে হলেও 'তামিল রকার্স' দেখা যেতেই পারে। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা