অন্য দেশে দশটা ভালো ট্রেলারের মধ্যে অন্তত চারটা ভালো সিনেমা পাওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের দেশে দশটা ভালো ট্রেলারের মধ্যে টেনেটুনে আধখানা হয়তো ভালো কন্টেন্টে রূপ নেয়, তাও সবসময় নয়। মাঝেমধ্যে ওই আধখানায় আবার 'এভারেজ' কন্টেন্ট নিয়েও সন্তুষ্ট থাকতে হয়...

একটা সময় ছিল, যখন ভালো নির্মাতা এবং ভালো একটা টিম না হলে সিনেমার ট্রেলারটা ভালোভাবে বানানো যেতো না। একারণে ট্রেলার দেখেই বোঝা যেতো, কোনটা ভালো সিনেমা হবে, আর কোনটা হবে জগাখিচুড়ি বা অখাদ্য। কিন্তু একটা সময়ের পর এডিটররা বেশ ভালোভাবেই ট্রেলার বানানোর কায়দাটা রপ্ত করে ফেললেন। কয়েকজন খুব ভালো কাজ করতেন আগে থেকেই, এখনও করেন। কিন্তু এডিটরদের মিডিওকার একটা দল তৈরি হলো, যারা দুই/আড়াই/তিন মিনিটের ট্রেলারেই মুন্সিয়ানা দেখাতে পারেন। কিন্তু গোটা সিনেমায় সেই ধারাবাহিকতাটা বজায় রাখতে পারেন না, কিংবা তাদের হাতে যথেষ্ট মালমশলাও থাকে না আসলে।

এতে ঝামেলায় পড়লো সাধারণ দর্শক। বিশেষ করে যারা ইউটিউবে ট্রেলার দেখে সিনেমা দেখবে কি দেখবে না সেটা ঠিক করতো। ধরুন দেলোয়ার জাহান ঝন্টু বা অনন্ত জলিলের সিনেমার ট্রেলার দেখেই আপনি বুঝতে পারবেন, এই সিনেমা আপনাকে হাসাবে। যুক্তিতর্ক ফেলে সেরকম এক্সপেক্টেশন নিয়েই আপনি হলে যাবেন। কিন্তু ভালো পরিচালকের বানানো চকমকে ট্রেলার দেখে অনেক আশা নিয়ে সিনেমা হলে যাওয়ার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই আশার বেলুনটা ফুটো হয়েছে আমার নিজেরই। বারবার ঠকতে ঠকতে সেই আপ্তবাক্যটা মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছি- আড়াই মিনিটের একটা ভালো ট্রেলার বানানো যত সোজা, দুই ঘন্টার একটা সিনেমা বানানো তারচেয়েও ঢের কঠিন। 

গত বছর একটা বাংলা সিনেমার ট্রেলার দেখে বেশ ভালো লেগেছিল। ট্রেলারটা মোটামুটি মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল, তেমন কিছু বুঝিইনি। তবু তার মধ্যে একটা ভালোলাগার আবেশ ছিল। ফেনী থেকে ঢাকায় এসে জ্যাম ঠেলে সীমান্ত সম্ভারের সিনেপ্লেক্সে গিয়ে তিন ঘন্টা ধরে সিনেমাটা 'সহ্য' করেছিলাম। টাকার শ্রাদ্ধ তো হয়েছেই, গরম আর পরিশ্রমটা নাহয় ভুলে গেলাম, সময়ের ব্যাপারটাও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি। কিন্তু একটা ব্যাপার ফেলতে পারিনি। 

সিনেপ্লেক্সে আমার পাশের সিটেই একটা কাপল এসেছিল সেই সিনেমা দেখতে। ইন্টারমিশনের সময় চোখেমুখে বিরক্তির ছটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে মেয়েটা ছেলেটাকে বলছিল- 'তুই আমাকে এই বা*র সিনেমা দেখাইতে নিয়ে আসছিস?' আমি এবং আমার পাশে বসে থাকা বাকিদেরও তখন মনে হয়েছে, এই মেয়ে আর কখনও হলে গিয়ে বাংলা সিনেমা দেখার নাম নেবে না। ছেলেটাও কখনও তার প্রেমিকাকে কোন 'বাংলা সিনেমা' দেখার সাজেশান দেয়ার সাহস পাবে না। রংচংয়ে টিজার-ট্রেলার বানিয়ে ভালো একটা কন্টেন্ট বানাতে না পারাটা এভাবেই নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট ফেলে দর্শকের ওপর, আমাদের ইন্ডাস্ট্রির ওপর। 

টিজার-ট্রেলার ভালো হলেও, বেশিরভাগ সময় মুখ থুবড়ে পড়ে 'কন্টেন্ট'

সমস্যাটা পুরনো, এবং সার্বজনীন। সব দেশে, সব ইন্ডাস্ট্রিতেই এটা আছে। হলিউডে আছে, বলিউডে আছে, সাউথ ইন্ডিয়ায় আছে, কোরিয়ায় আছে। ট্রেলার যতটা গর্জে, সিনেমা ততটা বর্ষে না অনেক সময়। কিন্তু বাংলাদেশের রেশিওটা এসব জায়গার চেয়ে অনেক বেশি। অন্য দেশে দশটা ভালো ট্রেলারের মধ্যে অন্তত চারটা ভালো সিনেমা পাওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের দেশে দশটা ভালো ট্রেলারের মধ্যে টেনেটুনে আধখানা হয়তো ভালো কন্টেন্টে রূপ নেয়, তাও সবসময় নয়। মাঝেমধ্যে ওই আধখানায় আবার 'এভারেজ' কন্টেন্ট নিয়েও সন্তুষ্ট থাকতে হয়। 

পণ্যের মোড়কটা (পড়ুন টিজার/ট্রেলার) চকচকে বানানোর দিকে আমাদের দেশের নির্মাতা/এডিটর বা পুরো টিমের যত মনোযোগ, তার সিকিভাগও গোটা কন্টেন্টটা ভালোভাবে বানানোর দিকে দেয়া হয় না। গল্পের গাঁথুনিতে কোথায় দুর্বলতা রয়ে গেছে, প্লটহোলগুলো ভরাট করা হলো কি হলো না, জোড়াতালি দেয়া ঘটনাপঞ্জি কিংবা জোর করে চাপিয়ে দেয়া ক্ল্যাইম্যাক্স নিয়েই তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়। 

একারণে দেখা যায়, এভারেজ কন্টেন্ট পেলেও অনেক সময় আমরা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠি, তুমুল প্রশংসায় ভাসাই। কারণ খারাপটা পেতে পেতে অভ্যস্ত আমরা 'মন্দের ভালো'র দেখা পেলেই আনন্দে আটখানা হয়ে যাই। ফলে যখন আমাদের মধ্যে কেউ একটা 'অজ্ঞাতনামা', 'মাটির প্রজার দেশে' বা 'শুনতে কি পাও' বানিয়ে ফেলে, যখন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের 'লাইভ ফ্রম ঢাকা' বাইরের দেশগুলোতে পুরস্কার জেতে, 'রেহানা মরিয়ম নূর' কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের অফিসিয়াল সিলেকশনে নির্বাচিত হয়, তখন আমরা বিস্ময়ে অভিভূত হই, এও আবার সম্ভব নাকি! 

অনেক কথা বলে ফেললাম। কারণ একটাই, বেশকিছু বাংলা কন্টেন্ট পাইপলাইনে জমে আছে। আরিফিন শুভ'র মিশন এক্সট্রিম, সিয়ামের অপারেশন সুন্দরবন এবং শান, আফরান নিশো ও সিয়ামের মরীচিকা- করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এগুলোর কোনোটি সিনেমা হলে মুক্তি পাবে, কোনোটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে আসবে। মিশন এক্সট্রিমের টিজার ভালো লেগেছে, শানের টিজারও বেশ ভালো হয়েছে। মুগ্ধ হয়েছি দীপঙ্কর দীপনের অপারেশন সুন্দরবনের ট্রেলার দেখে। একই রকমের অনুভূতি কাজ করেছে শিহাব শাহীনের 'মরীচিকা'র ট্রেলার দেখার পরও। 

কিন্তু ঘরপোড়া গরু তো সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। এগুলোর মধ্যে কয়টা কন্টেন্ট শেষমেশ টিজার/ট্রেলারের মানটা ধরে রাখতে পারবে, এটাই এখন দেখার বিষয়। শতকরার হারে আমাদের অতীতটা তো খুব বেশি সুখকর নয়, তাই কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটা ভবিতব্যই বলা চলে। ট্রেলারের পেছনে সিনেমার টিম যতটা যত্নবান হন, সেটুকু যত্ন নিয়ে তারা সিনেমা-সিরিজগুলো বানাবেন, পাইপলাইনে থাকা কন্টেন্টগুলো ভালো হবে, দর্শকের চাহিদা পূরণ করবে, বিনোদনের যোগান দেবে- এটাই চাওয়া থাকলো আপাতত।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা