মূলত, অদ্ভুত বিষয় এটাই, বলিউডের নির্মাণে 'ট্রান্স ক্যারেক্টার' রাখা যাবে, সে চরিত্রের বিষাদে দর্শককে একীভূতও করা যাবে, কিন্তু স্ক্রিপ্টের 'ট্রান্স' চরিত্রটিতে 'ট্রান্সজেন্ডার' কাউকে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়া হবেনা! এই অদ্ভুতুড়ে অর্থোডক্স মেন্টালিটি যে বলিউড ছাড়া আর কোনো ইন্ডাস্ট্রির নেই, তা বোধহয় না বললেও চলে।

'চণ্ডীগড় কারে আশিকী' চলচ্চিত্রে একজন 'ট্রান্স জুম্বা ট্রেনার' এর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বানী কাপুর। এবং তখন থেকেই শুরু হয়েছিলো এক বিতর্ক। এই সিনেমা মুক্তির পরেই শোরগোল উঠলো- কেন একজন 'ট্রান্স নারী'র চরিত্রে 'ট্রান্স' নারীকেই আনা হলোনা? যদিও লিড রোলে ট্রান্সজেন্ডার কাউকে আনা যে সিনেমার জন্যেই সমূহ ক্ষতি, সেটাও ছিলো নির্মাতাদের পক্ষে শক্তপোক্ত যুক্তি। এবং যুক্তিটা নেহায়েত ফেলনাও না। অডিয়েন্স প্রেক্ষাগৃহে যায় প্রধানত নায়ক-নায়িকার নামেই। সুতরাং, লিড রোলে একজন 'ট্রান্স নারী'কে অভিনয় করানোর যে ঝুঁকি, সেটাকেও খুব একটা উপেক্ষা করা যায় না। এবং সেটুকু বিবেচনায়, 'চণ্ডীগড় কারে আশিকী'তে বানী কাপুরের চরিত্রটিকে হয়তো মেনে নেয়াও যায়।  কিন্তু সেই একই সংজ্ঞা অনুযায়ী, কয়েকদিন আগে মুক্তি পাওয়া 'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি'তে 'ট্রান্স নারী'র চরিত্রে বিজয় রাজকে মেনে নিতে খানিকটা যেন কষ্টই হয়। সেই একই প্রশ্ন ওঠে আবার- এবার তো লিড রোলের হ্যাপা ছিলোনা, তাহলে সাইড ক্যারেক্টারে 'ট্রান্স নারী'র চরিত্রে আদতেই কোনো ট্রান্স নারীকে কেন নেয়া হলোনা? এ কি নিছক উদাসীনতা? নাকি, 'ট্রান্সজেন্ডার' কাউকে মেইনস্ট্রিম ফিল্মে অভিনয়ে সুযোগ দিতে এখনও বলিউডের সংস্কারগ্রস্থ হৃদয় দ্বিধাগ্রস্ত হয়? 

যদি 'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি'তে বিজয় রাজের অভিনয়ের কথা চিন্তা করা হয়, তাহলে সে অভিনয় যে খারাপ হয়েছে, এমনটা বলার সুযোগ মোটেও নেই। কিন্তু সিনেমায় বিশেষ চরিত্রে এই মানুষটির অভিনয় দেখে বারবার মনে হয়েছে, যদি কোনো ট্রান্সজেন্ডার মানুষ এই চরিত্রে অভিনয় করতেন, তাহলে কি রিয়েলিস্টিক এবং অনবদ্যই না হতো! সঞ্জয় লীলা বানসালীর মত মানুষ, যিনি কিনা চরিত্রকে রাখেন চরিত্রের অবয়বেই, 'পারফেক্ট কাস্টিং' নিয়ে যার খানিকটা অবসেশনই যেন আছে, সেই তার নির্মাণেও এরকম বৈষম্য খানিকটা যেন বিব্রতও করে! 

চণ্ডীগড় কারে আশিকী'র বানী কাপুর

ফিরি অন্য সিনেমায়। হরর-কমেডি সিনেমা 'লক্ষ্মী'র কথা নিশ্চয়ই মনে আছে অনেকেরই। সেখানেও 'ট্রান্স নারী'র এক চরিত্র ছিলো, যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শরদ কেলকার। প্রশ্ন উঠেছে তখনও, একজন পুরুষ কেন এরকম এক চরিত্রে অভিনয় করবে, যে চরিত্রে অভিনয় করার জন্যে বিশেষ এই 'এলজিবিটি' কমিউনিটির মানুষ খোদ ভারতেই আছে অগণিত? এই কমিউনিটির মানুষেরা দুয়েকটা বলিউডি সিনেমায় ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে যদি মিডিয়াপাড়ায় খানিকটা হলেও আত্মবিশ্বাসের সন্ধান পেতেন, তা কী খুব বেশি বাড়াবাড়ি হতো? এই মানুষেরা অভিনয়ে এলে বলিউডের কুলীনত্ব কি একেবারেই ঝাড়ে-বংশে নির্মুল হয়ে যেতো? 

'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি'তে বিজয় রাজ! 

খেয়াল করলে দেখা যাবে, বলিউডে স্কিলড 'ট্রান্স আর্টিস্ট'ও একেবারে কম না। ওয়েব সিরিজ 'পাতাললোক' এ 'ট্রান্স নারী' হেনথই মায়রেম্বাম যে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন, তা চোখে লেগে আছে অনেকেরই। নেটফ্লিক্সের 'বেগমজান' এ অভিনয় করলেন ইভাঙ্কা দাস, যিনি নিজেও একজন ট্রান্স নারী। অর্থাৎ বিষয়টা পুরোপুরিই এরকম, অজস্র ট্রান্স কুশীলব আছেন, যারা অভিনয়ের সুযোগ পেলে দুর্দান্ত অভিনয়ই করবেন৷ কিন্তু প্রশ্ন তো এটাই, তাদের যদি সুযোগই না দেয়া হয়, তাহলে তাদের প্রতিভাটুকু টের পাওয়া যাবেও বা কিভাবে?

মূলত, অদ্ভুত বিষয় এটাই, বলিউডের নির্মাণে 'ট্রান্স ক্যারেক্টার' রাখা যাবে, সে চরিত্রের বিষাদে দর্শককে একীভূতও করা যাবে, কিন্তু স্ক্রিপ্টের 'ট্রান্স' চরিত্রটিতে 'ট্রান্সজেন্ডার' কাউকে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়া হবেনা! এই অদ্ভুতুড়ে অর্থোডক্স মেন্টালিটি যে বলিউড ছাড়া আর কোনো ইন্ডাস্ট্রির নেই, তা বোধহয় না বললেও চলে। তবুও যেহেতু মানুষ আশায় বাঁচে, তাই আশা থাকে এটুকুই, হয়তো সামনে এই শ্রেণির মানুষদের অংশগ্রহণে আরো পরিপূর্ণ হবে ক্যামেরার চোখ, নির্মাণের ভূখণ্ড। সেটুকুই প্রত্যাশা। আর এটা তো সবারই জানা, একজন অভিনেতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য- অভিনয়। বাকি সবকিছু অর্থাৎ লিঙ্গ, গোত্র, আইডিওলজি... সবই গৌণ। এবং এটুকুকে বেদবাক্য মেনে, ট্রান্স নারীদের প্রাসঙ্গিক সব সিনেমায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিলে যে আদতে সিনেমার লাভ, এই  শ্রেণীর মানুষদের লাভ, সেটাও বলাই বাহুল্য।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা