এ মানুষটির অভিনয়ে শুধু শাহরুখ খানই না, বুঁদ হয়ে ছিলো গোটা উপমহাদেশই৷ 'হিন্দি সিনেমা'র অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে তাকে সমীহ করা হয়েছে বরাবর৷ 'বলিউডের স্বর্ণযুগ' এর প্রতিনিধি এই মানুষটির ঈশ্বরপ্রদত্ত অভিনয়শৈলীতে নিয়মিত সমৃদ্ধ হয়েছে উপমহাদেশের সিনেমা-সংস্কৃতি...

বলিউডের 'কিং খান' শাহরুখ খান'কে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কাকে অনুপ্রেরণা মেনে তিনি এসেছিলেন সিনেমার এই ঝলমলে তারাখচিত জগৎ এর বাসিন্দা হতে, তিনি বরাবরই একজন মানুষের নাম উচ্চারণ করেন। যে মানুষটির অভিনয়ে শুধু শাহরুখ খানই না, বুঁদ হয়ে ছিলো গোটা উপমহাদেশই৷ 'হিন্দি সিনেমা'র অন্যতম শক্তিশালী এক স্তম্ভ হিসেবে তাকে সমীহ করা হয় বরাবর৷ 'বলিউডের স্বর্ণযুগ' এর অন্যতম মহীরুহ এই মানুষটি ঈশ্বরপ্রদত্ত অভিনয়-প্রতিভা দিয়ে 'বলিউড'কে সমৃদ্ধ করেছেনও নানাভাবে। মানুষটির নাম মোহাম্মদ ইউসুফ খান। যাকে ডাকা হতো 'দ্য ফার্স্ট খান' নামেও। অবশ্য তাঁর আরেকটি নামও আছে। সে নাম, দিলীপ কুমার। হ্যাঁ, সেই দিলীপ কুমার, বলিউডের রোমান্টিক সিনেমাকে যিনি নিয়ে গিয়েছিলেন বিশেষ এক উচ্চতায়৷ সেই দিলীপকুমার, যিনি তাঁর অভিনয়জীবনে ভেঙ্গেছেন-গড়েছেন অজস্র রেকর্ড! 

ফল ব্যবসায়ী বাবা লালা গুলাম সারওয়ার খান এবং মা আয়েশা বেগমের ঘরে এক ডজন সন্তান৷ তাদেরই একজন ইউসুফ। বড় পরিবার হলে যা হয়, ঘরে সবার দিকে সমান মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয় না৷ সেটা দেখি ইউসুফের ক্ষেত্রেও। পরিবারের ঔদাসিন্যে বড় হতে থাকে সে। ঘরের চেয়ে বাইরে সময় কাটে বেশি। প্রতিবেশি রাজ এর সাথে বেশ খোলতাই বন্ধুত্ব হয়। এই রাজ পরবর্তীতে জনপ্রিয় হন 'রাজ কাপুর' নামে। এই দুই বন্ধুর খুনসুটি, পড়াশোনা আর গুলতানিতে কাটে ইউসুফের জীবনের প্রাথমিক অধ্যায়৷

বলিউডের 'কিং খান' এর আইডল তিনি! 

তখন সবে কৈশোর এর ব্যারিকেড ডিঙ্গিয়েছেন। গলা ভাঙ্গছে। নাকের নীচে সদ্য আত্মপ্রকাশ করেছে গোঁফের রেখা। টালমাটাল এই বয়সে বাবার সাথে একদিন হলো বচসা। টনটনে আত্মসম্মান বুকপকেটে পুরে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন ইউসুফ। ঘর থেকে তো রাগের মাথায় বের হলেন। এবার যাবেন কোথায়! 'যায় চোখ যেদিক, যাবো সেদিক' বলে শেষমেশ 'পুনে' শহরে এলেন। নিজের যোগ্যতায় জুটিয়ে নিলেন টুকটাক কাজ৷ কাজ করে হাতে যখন সামান্য কিছু অর্থ জুটলো, চুক্তিতে খুলে বসলেন এক দোকান; স্যান্ডউইচের দোকান। চুক্তি যখন শেষ হলো, উপার্জিত কয়েক হাজার টাকা 'হাতের পাঁচ' বানিয়ে ফিরলেন বাড়ি।  

টাকা উপার্জনের নেশা একবার শুরু হলে, সে নেশাকে দমন করা বেশ দুরূহ৷ ইউসুফ বাড়ি ফিরে বেকার বসে থাকতে চাইলেন না। কাজের সন্ধানে ঘুরতে লাগলেন এখানে ওখানে। পাকেচক্রে দেখা হয়ে যায় ডঃ মাসানি'র সাথে। মাসানি ইউসুফকে বললেন 'বোম্বে টকিজ' এ কাজ করার জন্যে। ইউসুফ যথারীতি গেলেন সেখানে৷ দেখা হলো দেবীকা রানীর সাথে, যিনি তখন 'বোম্বে টকিজ' এর কর্ণধার। দেবীকা রানী, ইউসুফকে চাকরী দিলেন তার প্রতিষ্ঠানে। মাসিক বেতন ১২৫০ টাকা। সেখানে আস্তে আস্তে সিনেমাজগতের রথি-মহারথিদের সাথে পরিচয় হলো, নৈকট্য বাড়লো।

প্রথমদিকে ইউসুফের কাজ ছিলো স্ক্রিপ্ট রাইটিং এবং স্ক্রিনপ্লে'তে সাহায্য করা। ইউসুফের 'হিন্দি ভাষা'র চোস্ত জ্ঞান, বেশ সাহায্য করেছিলো এই বিশেষ বিভাগকে৷ এভাবেই চলছিলো। আচমকা একদিন দেবীকা রানী তাঁর জন্যে নিয়ে আসেন সিনেমার এক অফার। ইউসুফের সৌম্যদর্শন অবয়ব আর অভিনয় নিয়ে প্রখর জ্ঞান দেখে দেবীকা রানী ভেবেছিলেন, এই তরুণ সিনেমায় নামলে খুব একটা খারাপ করবে না৷ তবে সিনেমার প্রস্তাবের পাশাপাশি তিনি একটি অনুরোধও করেন ইউসুফকে। পিতৃপ্রদত্ত নাম পরিবর্তন করতে হবে। অগত্যা নাম পালটে যায়।  ইউসুফ ঢুকে যান 'দিলীপ কুমার' এর খোলসে। 

'জোয়ার ভাটা' সিনেমা দিয়ে শুরু করেন ক্যারিয়ার! 

দিলীপ কুমারের প্রথম সিনেমা 'জোয়ার-ভাটা।' সিনেমাটি ফ্লপ হয়। নবাগত দিলীপ কুমার কারো দৃষ্টিগোচরে আসেন না। অশোক কুমার তখন টকিজে দোর্দণ্ডপ্রতাপে অভিনয় করছেন। তিনি দিলীপ কুমার'কে পরামর্শ দেন, স্বাভাবিক অভিনয় করতে বলেন। দিলীপ কুমারের মনে ধরে পরামর্শ। অভিনয়েও আসে পরিবর্তন। মাঝখানে আরো কয়েকটি সিনেমা ফ্লপ হওয়ার পর 'জুগনু' সিনেমায় তিনি দুর্দান্ত অভিনয় করেন। ব্লকবাস্টার হিট হয় সিনেমা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। পরবর্তীতে আরো কিছু 'বক্সঅফিস হিট' সিনেমার পরে আসে কাল্ট ক্লাসিক 'আন্দাজ।' ছোটবেলার বন্ধু রাজ কাপুর, খ্যাতিমান অভিনেত্রী নার্গিসের সাথে চুটিয়ে অভিনয় করেন তিনি এখানে। বক্স অফিসেও তুমুল তোলপাড় করে এ সিনেমা৷ 

কাল্ট ক্লাসিক 'আন্দাজ' নিয়ে কথা হয় আজও! 

এরপরের সময়টা মিশ্র। কিছু সিনেমা ফ্লপ হয়। অধিকাংশ সিনেমা ব্লকবাস্টার হিট৷ তবে এরইমধ্যে এক সংকট দেখা দেয়। এত বেশি ট্রাজিক রোলে তিনি অভিনয় করেছিলেন, বাস্তব জীবনেও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। সেলুলয়েডের ট্রাজেডির বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে তাঁর নামই হয়ে যায় 'ট্রাজেডি কিং।' প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, দিলীপ কুমার মেথড অ্যাক্টিং করতেন৷ বলিউডে 'অ্যাক্টিং' এর এই বিশেষ জনরাকে তিনিই এনেছিলেন প্রথম। যাই হোক, প্রসঙ্গে ফিরি। সিনেমার চরিত্রগুলোর হতাশা তাকে বাস্তব জীবনে ক্রমশ মানসিকভাবে অসুস্থ করে দিচ্ছিলো। তিনি সাইক্রিয়াটিস্টের পরামর্শ নেন। সাইক্রিয়াটিস্ট তাকে কিছুদিন এসব রোলে অভিনয় করতে নিষেধ করেন। দিলীপ কুমার হাল্কা ধাঁচের চরিত্রে অভিনয় করা শুরু করেন তখন। কিছু কমেডি সিনেমায় অভিনয় করেন এ সময়ে৷ সে সব সিনেমা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলো। 

এরপরে দাগ, মুঘল-ই-আজম, হাতি মেরা সাথি, গঙ্গা যমুনা, বৈরাগ এর মতন কালজয়ী সিনেমাতে অভিনয় করেন। ডেভিড লিনের মাস্টারপিস 'লরেন্স অব অ্যারাবিয়া'তেও অভিনয়ের প্রস্তাব এসেছিলো তাঁর কাছে। তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও এ নিয়ে আক্ষেপ করেননি তিনি কখনোই। তবে দিলীপ কুমার যদি কাজটি করতেন, হলিউডেও ছড়িয়ে যেতো তার দীপ্তি! তাই, তাঁর আক্ষেপ না থাকলেও, আমাদের খানিকটা দীর্ঘশ্বাস রয়েই যায়। 

মাস্টারপিস 'মুঘল-ই-আজম' দিলীপ কুমার-মধুবালা জুটির শেষ সিনেমা! 

অভিনয়জীবনে এত সফলতার কারণেই হয়তো ব্যক্তিজীবনে অতটা সফল হতে পারেননি তিনি কখনোই৷ নায়িকা কামিনি কৌশলের সাথে প্রেম করেছেন। কিন্তু, সে প্রেম পূর্নতা পায়নি। নায়িকা মধুবালার সাথে প্রনয় হয়েছে। দিলীপ কুমার-মধুবালা জুটি চুটিয়ে প্রেম করেছেন দীর্ঘদিন। সেই সম্পর্কও শেষে এসে পূর্ণতা পায়নি। এরপর গুজব ওঠে, নায়িকা বৈজয়ন্তীমালার সাথে প্রেম করছেন তিনি। সে প্রেমও টেকেনি। পরবর্তীতে সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিয়ে করেন অভিনেত্রী সায়রা বানুকে। যিনি কী না বাইশ বছরের ছোট ছিলেন, দিলীপকুমারের চেয়ে! দ্বিতীয় বিয়ে করেন 'আসমা সাহিবা' নামের একজনকে। এ বিয়ে না টিকলেও প্রথম স্ত্রী সায়রা বানুর সাথে সম্পর্ক আজও অটুট। নিঃসন্তান দম্পতি তারা৷ যদিও সায়রা বানু একবার অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন। কিন্তু শারীরিক কিছু সমস্যার জন্যে সে সন্তানকে বাঁচানো যায় নি। এরপর থেকে এই দম্পতি আর সন্তানের আশা করেননি কোনোদিন। সুতরাং, এটা বলা হয়তো ধৃষ্টতা হবে না, সিনেমায় অজস্র 'হিট' উপহার দিলেও, দিলীপ কুমারের ব্যক্তিগত জীবনে "ফ্লপ' এর নিরবিচ্ছিন্ন সমাবেশই ঘটেছে ক্রমশ! 

দিলীপ কুমার- সায়রা বানু 

ভারতীয় অভিনেতা হিসেবে সর্বোচ্চ সংখ্যক পুরস্কার পেয়ে 'গিনিজ বুক অব ওয়ার্ল্ড' এ নাম লিখিয়েছেন তিনি। প্রথম অভিনেতা হিসেবে 'ফিল্মফেয়ার বেস্ট অ্যাক্টর অ্যাওয়ার্ড' পেয়েছেন। তাঁর সময়ের শীর্ষস্থানীয় সব নায়িকাদের সাথে অভিনয় করেছেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি দুর্দান্ত সব সিনেমা উপহার দিয়েছেন, যেগুলো সমালোচকের বিস্তর প্রশংসা কুড়িয়েছে আবার বক্স অফিসেও ভাংচুর করেছে। এই পঞ্চাশের দশকেই তিনি সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত নায়ক হিসেবে আলোচিত হয়েছিলেন।

হিন্দি সিনেমার 'স্বর্নযুগ' এ প্রবল দাপটে রাজত্ব করা এই মানুষটি  শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন আজ। এই প্রয়াণের মধ্যে দিয়ে বলিউডের স্বর্নালী অধ্যায়ের সর্বশেষ প্রতিনিধিদের অন্যতম মানুষটিও হয়ে গেলেন অতীত। তবে নশ্বর দেহের বিনাশ হলেও, তাঁর যাবজ্জীবন অনন্য সব কীর্তির ফলশ্রুতিতে তিনি যে আরো বহুকাল মানব-হৃদয়ে আসীন থাকবেন বহাল তবিয়তে, তা বলাই বাহুল্য। 

বিনম্র শ্রদ্ধা।  


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা