'ট্রিপলিং' টিভিএফ এর দুর্দান্ত কাজ না। টিভিএফ যেরকম কন্টেন্ট বানায়, সেসবের সাথে তুলনায় হয়তো এই ওয়েব সিরিজ খানিকটা পিছিয়েই থাকবে। কিন্তু, ক্রমশ ব্যস্ত ও একা হয়ে যাওয়া এ পৃথিবীতে এই গল্প খানিকটা বিষন্ন করার সুযোগ দেয়। বুঝতে শেখায়- যত দূরেই যাওয়া হোক না কেন, পরিবারের সুতো কখনোই ছেড়ে না। দূরত্ব বাড়লেও মায়া কমে না...

কমলারঙা এক গাড়ি ছুটছিলো তপ্ত দুপুরের পিচগলা রাস্তায়৷ গাড়িতে তিন যাত্রী। তিন ভাই-বোন। কালেভদ্রে দেখা হয় তাদের। যাদের মধ্যবর্তী টান একসময়ে খুব গাঢ় থাকলেও এখন বোধহয় অতটা না। ব্যক্তিগত জীবনের টানাটানিতে ওঠে নাভিশ্বাস, উঁকি মেরে দেখা হয়না অন্য কারো অন্দরমহল। তবুও আচমকাই একদিন ফুরসত মেলে। বড় ভাইয়ের বিবাহ-বিচ্ছেদ, ছোট ভাইয়ের উড়নচণ্ডী স্বভাব আর বোনের স্বেচ্ছা-বনবাস মেশে একবিন্দুতে। গাড়ির চাকা গড়ায়। তিন প্রাণীকে নিয়ে এগোতে থাকে গন্তব্যে। ক্রমশ এগোতে থাকে গল্পের শাখাপ্রশাখাও। 'বার্ডস আই' ভিউ থেকে চোখ রাখি এ গল্পে। যে গল্পের নাম- ট্রিপলিং। উদ্ভট রোডট্রিপের মাঝে যে গল্পে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে কিছু জীবনবোধও। হয়তো এই যাত্রীদের পুরো জার্নির সাথে আমরা ঠিক রিলেট করার সুযোগ পাই না। কিন্তু, তা সত্বেও, এ গল্পের জীবন-ঘনিষ্ঠ বার্তাগুলো ঠিকই যেন স্পর্শ করে যায় কোথাও। 

চন্দন, চঞ্চল, চিতভান... এই ত্রয়ীর রোডট্রিপের প্রথম সিজনটা বেশ মনে ধরেছিলো। মুম্বাই, মানালি, জয়পুর, ভাটিন্ডার পথেঘাটে তাদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার পুরো সময়ের অদৃশ্য সঙ্গীও ছিলাম। জীবনে হিসেবের পাশাপাশি বেহিসেবটাও যে জরুরি, এই বার্তার যেমন সন্ধান পেয়েছিলাম, তেমনি 'প্রনব' চরিত্রটা ক্ষণেক্ষণেই বুঝেয়েছিলো- সমাজের চাপে খোলসবদ্ধ আমাদের জীবনের দোটানাও। যদিও এসব রিয়েলিটির মাঝে মাঝে 'মার্কো পোলো'র মত চরিত্রের অনুপ্রবেশ ঠিক জুতসই লাগেনি, তবে যাত্রাপথের দুই একটা অহেতুক ঘটনার মত উপেক্ষাও করা গিয়েছিলো সেসব। এবং, এভাবেই নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার হাওয়ায় ভেসে সবাই যখন শেষমেশ 'আম্মা'স প্লেস' নামের সেই বাংলোয় পৌঁছালো, দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়েছিলো। মানালির হিম বাতাস, সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেষে এই যে 'আম্মাস প্লেস' নামের স্কেপ রুট, উটকো বিড়ম্বনাকে কোনো এক বয়ামে আটকে রেখে যেখানে এসে ঝাড়া হাত-পা হয়ে বসা যায়, ব্যস্ততাকে উপেক্ষা করা যায়.. এরকম একটা জায়গা দেখে আক্ষেপে লীন হয়েছি। হওয়াটা বোধহয় স্বাভাবিকও। জীবনের কোনো না কোনো নাভিশ্বাসের অংশে এরকম একটা স্বস্তি ফেলার জায়গা যদিও থাকা জরুরি, কিন্তু তা আমাদের আছেও বা কই? তবে সে যাই হোক, থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের ফ্যামিলির সাথে এই রি-ইউনিয়নটা বেশ মনে ধরে সেবার। বেশ অন্যরকম এক রেশ নিয়েই শেষ হয় 'ট্রিপলিং' এর প্রথম সিজন। 

গভীর বিস্ময়ে লক্ষ্য করি- 'ট্রিপলিং' এর দ্বিতীয় সিজনে গাড়ি পালটে যাওয়ার সাথে সাথে যেন পালটে যায় গল্পের দিকঠিকানাও। অনেক চরিত্র আসতে থাকে গল্পে। গল্পের সাথে সেসব চরিত্রের সম্পর্ক যদিও ক্ষীণ, তাও চরিত্রদের আসা-যাওয়া রুখে দেয়া যায় না। বিস্তীর্ণ হাভেলি আগলে রাখা পাগলাটে প্রিন্স চরিত্রে গজরাজ রাও, নাইন্টিজের 'ব্যোমকেশ বক্সী' হিসেবে রজিত কাপুরের অংশটুকু খুব যে খারাপ লাগে, তাও না৷ কিন্তু, মূল গল্পের সাথে সংযোগটুকু যেন 'ধরা যাক' এর অঙ্কের মতই অলীক থেকে যায়। 'ট্রিপলিং' এর সিনেমা অ্যাডাপ্টেশন, প্রনবের আচমকা নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, চঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া, প্রনবের নিখোঁজের সাথে খুনের সংযোগ ঘটিয়ে আচমকা থ্রিলারের মোড়ক, সে সাথে কোলকাতার রসগোল্লা আর গ্যাংটকের ঠাণ্ডা মোমো... গল্প এমনভাবেই ছুটতে থাকে দ্বিতীয় খণ্ডে, থেকে থেকেই মনে হয়- নেশায় বুঁদ কোনো পাঁড় মদ্যপ আচমকা হাত বসিয়েছে স্টিয়ারিং হুইলে। গাড়িও ছুটছে দিগ্বিদিক। 'ট্রিপলিং' এর প্রথম সিজন দেখে যারা খানিকটা হলেও মুগ্ধ হয়েছিলেন, তাদের মুগ্ধতার সমাপ্তি বেশ কাঠখড় পুড়িয়েই করা হয় দ্বিতীয় খণ্ডের এ আষাঢ়ে গপ্পে। যদিও প্রথমবারের মত এ সিজনেও কিছু বার্তা দেবার চেষ্টা করেন শো রাইটারেরা। কিন্তু সেসব জমেনা। এত এত  উদ্ভট নাটকীয়তার ভীড়ে এই লাইফ লেসনগুলো খুব মর্মান্তিকভাবে খায় হোঁচটও। 

মিলেমিশে এমন সম্পর্কই চাই আমরা সবাই

হয়তো এ কারণেই 'ট্রিপলিং' এর সর্বশেষ সিজনে আবারও গ্রাউন্ডেড অ্যাপ্রোচ দেখি। হয়তো যে কারণেই, শেষ সিজনে রোডট্রিপে আর কোনো গাড়িই নেয়া হয়না। কখনো পয়দলে, কখনো উদ্ভট সেই স্কুটিতে তিন ভাইবোন হন সওয়ার। প্রথম সিজনে যে বাবা-মা'র প্রগ্রেসিভ মেন্টালিটি দেখে অনেকেই ঈর্ষা করেছিলেন, এই সিজনে সেই বাবা-মা'ই নেন বিচ্ছেদের আচমকা সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্ত ক্রমশ দূরবর্তী হয়ে যাওয়া তিন সন্তানকে আবারও করে একাট্টা। 'ক্রাইসিসের সময়েই তো ফ্যামিলির দরকার' বাক্যকে সার্থক করে তিন ভাই-বোন মুখোমুখি হয় বাবা-মা'র। মানালি'র সেই 'আম্মা'স প্লেস' এ। যেখানে চাপা ফিসফিসে শুনতে পাই- এই স্কেপ রুট, এই নষ্টালজিয়ার 'আম্মা'স প্লেস'ও নাকি বিক্রি করে দিয়েছে চন্দন-চঞ্চল-চিতভান এর মা-বাবা! 

একটা ডিসফাংশনাল ফ্যামিলির চরিত্রদের মধ্যকার সম্পর্কজনিত জটিলতার মধ্যেও যে না বলা একটা টান আছে, সে টানটুকু ক্রমশই টানটান হয় এ গল্পে। যে বাড়িতেই কেটেছে শৈশবের দিনগুলো, সে বাড়িই যখন ভেঙ্গে ফেলার তোড়জোড় চলে, তখন একছুটে বাইরে এসে বৃষ্টির মধ্যে দিশেহারা হয়ে কাঁদতে দেখি এমন এক চরিত্রকে, যে চরিত্র জীবনকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি কখনো। প্রিয় সবকিছুকে হারিয়ে যে চরিত্র আচমকাই বুঝতে পারে- সে আসলে সবকিছু বিনা আপোষে মেনে নিলেও, মানেনা সম্পর্কের ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া অবয়ব। পরিবার যার কাছে সবসময়েই আগলে রাখার বস্তু। ভালোবাসার বিষয়। বৃষ্টির মধ্যে তিন ভাইবোন গুটিসুটি হয়ে বিষাদ ভাগাভাগি করে নেবার যে দৃশ্য, সেটা দেখলে তাই অকারণেই মন খারাপ হয়, ভিজে ওঠে ভেতরটা। পুরোনো মানুষ, পুরোনো স্মৃতিরাও কি খানিকটা আসতে চায় সমুখে? হতে পারে! 

প্রিয় সে দৃশ্য! 

'ট্রিপলিং' টিভিএফ এর দুর্দান্ত কাজ না। টিভিএফ যেরকম কন্টেন্ট বানায়, সেসবের সাথে তুলনায় হয়তো এ ওয়েব সিরিজ খানিকটা পিছিয়েই থাকবে। কিন্তু, ক্রমশ ব্যস্ত ও ক্রমশ একা হয়ে যাওয়া এ পৃথিবীতে এই গল্প খানিকটা বিষন্ন করার সুযোগ দেয়। প্রিয় মানুষদের খানিকটা কাছে আসতে বলে। 'আম্মা'স প্লেস' দেখিয়ে নিজের ঘরকে মনে করায়।  বুঝতে শেখায়- যত দূরেই যাওয়া হোক না কেন, পরিবারের সুতো কখনোই ছেড়ে না। দূরত্ব বাড়লেও মায়া কমেনা। হয়তো উপরে শক্ত প্রলেপ জমে। কিন্তু, সেটুকু ভেঙ্গে ফেললেই আবার সব আগের মত। জড়োসড়ো ছোটবেলার মত। হারিয়ে ফেলা অতীতের মত।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা