সাকুল্যে তেইশ মিনিটের 'মরিবার হলো তার স্বাদ' ছিমছাম এক নির্মান। এই নির্মান 'অ্যান্থোলজি' সিরিজের বাকি পর্বগুলোর উৎকর্ষের বেশ স্পষ্ট এক ইঙ্গিত দিয়েছে। সিরিজের নির্মানগুলো এক্সপেরিমেন্টাল হবে বলে যে কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিলো, সেই পালেও জোরদার হাওয়া দিয়েছে এই পর্ব...

গল্প থেকে নাটক বা সিনেমার অ্যাডাপ্টেশন হলে সেগুলোর মান নিয়ে সাধারণত নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। এ বছরের মাঝামাঝি স্ট্রিমিং সাইট 'বঙ্গ'তে যখন 'বঙ্গ বব' সিরিজে সাতটি গল্প থেকে সাতটি নাটক নির্মান করা হলো, গল্পগুলোর বৈচিত্র‍্য ও নাটক নির্মানের মুন্সিয়ানায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। এই সিরিজের অধিকাংশ নাটকই ছিলো দুর্দান্ত; বিষয়-নির্মান দু'দিকেই। এ কারণেই শিবব্রত বর্মনের গল্প অবলম্বনে স্ট্রিমিং সাইট 'চরকি'তে আসা সাইকোলজিক্যাল অ্যান্থোলজি 'ঊনলৌকিক' সিরিজ নিয়ে খানিকটা বেশি আগ্রহ ছিলো৷ গতকাল এই সিরিজের প্রথম নির্মান 'মরিবার হলো তার স্বাদ' দেখে সে আগ্রহ আরো খানিকটা বাড়লোই যেন। 

জীবনানন্দ দাশের 'আট বছর আগের একদিন' কবিতার খুব বিখ্যাত এক লাইন 'মরিবার হলো তার সাধ' কে কেন এখানে 'মরিবার হলো তার স্বাদ' করা হলো, তা নিয়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন অনেকেই। বিখ্যাত লেখক শিবরাম চক্রবর্তী যেমন তার লেখায় শব্দগুলোকে নানাভাবে টুইস্ট করতেন, নানাভাবে উল্টেপাল্টে দেখতেন, ইংরেজিতে যাকে Pun (পান) বলে, ঠিক সেটাই করেছেন শিবব্রত বর্মন তার এই গল্পে। এবং এই পানিং এর কারণে গল্পের শিরোনামে যেমন চমক আসে, শেষে গিয়ে এই শিরোনাম আবার বেশ ভালোভাবে মিলেও যায় গল্পের মূলভাবের সাথে।

গল্পের নায়ক কবির, যিনি এক বিশেষ মানসিক রোগে আক্রান্ত। রোগটির নাম 'বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার' বা বিপিডি। যে রোগে আক্রান্ত রোগীরা ক্রমশ শূন্যতাবোধে আক্রান্ত হয়৷ চারপাশের সবকিছুর উপরে এক বিদ্বেষ জমা হয় তাদের। জীবনের উপর বিতৃষ্ণা চলে আসায় তারা নিয়মিত আগ্রহী হন আত্মহত্যার দিকে। কবিরের আচরণেও আমরা তেমনটাই লক্ষ্য করি। জীবন নিয়ে যিনি বিভ্রান্ত। যিনি এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবার আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সফল হননি। একজন মনোরোগীর শরণাপন্ন হয়েছেন, তিনিও খুব একটা জুত করে উঠতে পারেননি কবিরের আরোগ্যের ব্যাপারে। 

এরকমই যখন অবস্থা, তখন একদিন কবির খবর পায় রহস্যময় এক খাবারের দোকানের। যেখানে প্রতি মাসের এক বিশেষ দিনে রান্না করা হয় পটকা মাছ বা পাফার ফিশ। এই মাছের বিশেষত্ব, মাছটির পিত্তথলিতে খুব শক্তিশালী বিষ থাকে। ভালোভাবে পরিষ্কার না করলে এই মাছ খেলে অবধারিত মৃত্যু। এই রহস্যময় হোটেলের কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে নয়জন মানুষকে নয়টি পাফার ফিশ রান্না করে খাওয়ায়। নয়টির মধ্যে আটটি মাছের বিষ অপসারণ করা হয়,  করা হয় না শুধু একটির। কিন্তু কোন মাছটি বিষের বিষাদে নীল থাকবে, তা অজানা। অনেকটা রাশিয়ান রুলেতের মতন এই ডেলিকেসির নিয়ম। যারা মরতে চান, তাদের জন্যে এই বিশেষ আয়োজন। কবির যুক্ত হন মাসিক এই বিশেষ ভোজের সাথে। এরপর?

নির্মানে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন নির্মাতা! 

শিবব্রত বর্মনের গল্পটা পড়া ছিলো। মূল গল্পটির প্রেরণার সাথে সৃজিত মূখার্জীর 'হেমলক সোসাইটি' এবং নেটফ্লিক্স এর টিভি সিরিজ 'আফসোস' এর সামঞ্জস্য খুঁজে পেলেও সেটা ধর্তব্য নয়। নাটকে, গল্পের প্রায় পুরোটাই অবিকৃত রেখেছেন পরিচালক রবিউল আলম রবি। তার আগের কাজগুলোর মতন এই নির্মানটিতেও নিজের কিছু স্বকীয় ছাপ রেখেছেন, যেটা প্রশংসা করার মতন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই অ্যান্থোলজির নির্মাতা গত দুই বছর কোনো নির্মানের সাথে যুক্ত ছিলেন না। চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছেন৷ সে পড়াশোনার ছাপও বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ক্যামেরার কাজে, দৃশ্যাবলীতে। কালার স্কিম, সিনেম্যাটোগ্রাফী, সংলাপ...সবখানেই বেশ পরিচ্ছন্নতা ও পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন নির্মাতা। এই নির্মানের চিত্রনাট্য ও প্রোডাকশন ডিজাইনিং এ রবিউল আলম রবির সাথে কাজ করেছেন 'তাকদীর'খ্যাত সৈয়দ আহমেদ শাওকি। তাদের দুইজনের মিলিত প্রচেষ্টা যে বেশ উপাদেয় রূপ ধারণ করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সিনেম্যাটোগ্রাফীতেও বিস্তর চমক ছিলো! 

কুশীলব তালিকা খুবই সংক্ষিপ্ত। তাদের মধ্যে 'কবির' চরিত্রে মোস্তফা মনওয়ার প্রোটাগনিস্ট, গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বরাবরের মতনই সাবলীল। 'লাইভ ফ্রম ঢাকা'য় তার দারুণ অভিনয়ের পরে এই কাজটি দেখে আবার ভালো লাগলো। বিভ্রান্ত চেহারা, মানসিক টানাপোড়েন, অদ্ভুতুড়ে আচরণ... বেশ ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুললেন পর্দায়। 'মনোরোগ বিশেষজ্ঞ' চরিত্রে গাজী রাকায়েত ভালো করেছেন। এই চরিত্রের খুব বেশি লেয়ার বা স্পেস না থাকায়, মারাত্মক কাজ করেছেন তিনি, এমনটা বলার জায়গা নেই। তবে ঠিকঠাক। সুমন আনোয়ার সহ আরো যে দুই-একজন অভিনয় করেছেন সহশিল্পী হিসেবে, তারা তাদের সবটা দেয়ার চেষ্টাই করেছেন। খাপছাড়া অভিনয় লাগেনি।

প্রোটাগনিস্ট চরিত্রে মোস্তফা মনওয়ার অনবদ্য! 

সাকুল্যে তেইশ মিনিটের এই ছিমছাম নির্মান দেখে ভালো লেগেছে। 'অ্যান্থোলজি' সিরিজের বাকি পর্বগুলো নিয়েও প্রত্যাশা বেড়েছে সমানুপাতিক হারে। 'চরকি'র পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো, এই সিরিজের নির্মানগুলো একটু এক্সপেরিমেন্টাল হবে। সেই নিরীক্ষার শুরুটা যে বেশ আশাব্যঞ্জক, তা বলাই বাহুল্য। চোখ থাকবে গুনী তারকায় ভরা 'ঊনলৌকিক' সিরিজের বাকি পর্বগুলোর দিকেও। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা