যখন শিবব্রত বর্মনের মতো লেখক, রবিউল ইসলাম রবির মতো নির্মাতা, ইন্তেখাব দিনারের মতো অভিনেতা একসাথে কাজ করার সুযোগ পান, তখনই কেবল এমন আউটস্ট্যান্ডিং কিছু করা সম্ভব। আই ক্যান প্রাউডলি ব্র্যাগ নাও যে, আমাদের একজন ইন্তেখাব দিনার আছেন!

আমার খুব ইচ্ছা করে দর্শক হিসেবে জানেন যে, আমাদের দেশের কোন এক্টরকে নিয়ে ব্র্যাগ করবো। বলবো বন্ধুদের যে, শালায় ফাটায়া এক্টিং করসে। বিশ্বাসই হয় না আমাদের দেশে এমন এক্টিং করা লোক আছে। কিন্তু ঘুরেফিরে আমার প্রশংসা করে লাগে ঐ পঙ্কজ ত্রিপাঠি, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীকে নিয়ে। তারপর চঞ্চল, মোশাররফ করিমে মাঝেমধ্যে তৃপ্তি পাই। কিন্তু একটা আছে না, মাস্টারক্লাস এক্টিং। কেবল গুড এক্টিং না, যেটা দেখে মাথা নষ্ট হয়ে যাবে ওরকম টাইপের এক্টিং। ওরকম কিছু দেখার সাধ অনেকদিনের। 

ঊনলৌকিক সিরিজটা এতভাবে চমকে দিয়েছে আমাকে যে নতুন করে এক্সপেক্টেশন গড়তেও কিছুটা সময় লাগে। মনে হয় যে- এর চেয়ে ভালো আর কী হবে। অথচ শেষের জন্যই যে সবচেয়ে ভালোটা লুকোনো ছিল ভাবতে পারি নি। গল্প বাদ দেই, টেকনিক্যাল সব এঙ্গেল বাদ দেই; ২৪ মিনিট ৫১ সেকেন্ডের এপিসোড 'দ্বিখণ্ডিত'-তে ইন্তেখাব দিনার যে এক্টিং মাস্টারক্লাস দেখালেন এটা অনেকদিন মনে থাকবে আমার। দুর্দান্ত, অসাধারণ, অনবদ্য, এসব বিশেষণ খুব হালকা মনে হচ্ছে তার পারফর্মেন্স দেখার পর।

গল্পটা তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাধারণ এক ক্লার্ক মোশতাকের। যে কীনা পুলিশ স্টেশনে বসে এসআইয়ের সাথে কথা বলছে। বলছে হিলারি স্টেপসের কথা, এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার আগে সবচেয়ে বড় একটা দেয়াল যার জন্য অনেকেই এভারেস্ট জয় করতে পারে না। এভারেস্ট জয় করতে যাওয়া এক ব্রিটিশ একবার বলল যে হিলারি স্টেপস নাকি গায়েব হয়ে গেছে, সে গিয়ে পায় নি। অন্যদিকে শেরপারা বলছে ভিন্ন কথা, তারা বলছে হিলারি স্টেপস আগের জায়গাতেই আছে। 

এরকম অনেকগুলো ঘটনা সে তুলে ধরে যেখানে দুটি ঘটনা ঘটেছে একই সময়ে, কিন্তু দুটোই আসলে ঘটেছে, দ্বৈত সত্য। কেন সে এই উদাহরণগুলো দিচ্ছে, কী কী রহস্যজনক ঘটনা ঘটছে আমাদের চারপাশে, কেনই বা সে পুলিশ স্টেশনে বসে এসব বলছে, উত্তর পাওয়া যাবে সবকিছুরই। ইন্তেখাব দিনার এই পর্বের পুরোটা জুড়ে। 

পুরোটাই বলা যায় দিনারের মনোলগ। কখনো পানি খাবার বিরতি নিয়েছেন শুধু, কখনো বা চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে একটু থেমেছেন। কী নাটকীয়তা, কী বর্ণনা ভঙ্গী, আমার খুব জানার ইচ্ছা কতটুকু দিনার ইম্প্রোভাইজ করেছেন সেখানে! ক্যামেরা শুধু ইন্তেখাব দিনারের মুখের সাথে, দিনার বলেই যাচ্ছেন, ক্যামেরা সঙ্গ দিচ্ছে। আমরা পিছনে তাকালে দেখতে পাচ্ছি পুলিশ স্টেশনের দৈনন্দিন ব্যস্ততা। 

একবার হয়তো চোখ যাবে সর্বোচ্চ, বাকিটা সময় চোখ দিনারের ওপর থেকে সরবেই না। দিনার যেন নিজ হাতে আটকে রেখেছেন দর্শকের মনোযোগ। তার গল্প এতো ইন্টারেস্টিং, তার বলার ধরণ এতো চমৎকার, চাইলেও মনোযোগ অন্য দিকে দেয়া সম্ভব না। দিনারের হাসি, ব্যঙ্গ, আত্মবিশ্বাস, ডায়লগ ডেলিভারি, সারল্য, ধূর্ততা সবকিছুই উঠে এসেছে এই ২৪ মিনিটে। ডায়লগগুলো এতো নিখুঁতভাবে লেখা। বিশেষ করে প্রথম ২-৩ মিনিটের ডায়লগগুলোতে স্ল্যাং ল্যাংগুয়েজ ইউজ করা খুবই দারুণ লেগেছে। 

‘দ্বিখণ্ডিত’কে ঊনলৌকিক সিরিজের বেস্ট এপিসোড বলা যায় স্রেফ ইন্তেখাব দিনারের জন্য। দিনারের অতিমানবীয় পারফর্মেন্সের জন্য। আফসোসও লাগে যে আমাদের হাতে এরকম অভিনেতা থাকার পরও আমরা ব্যবহার করতে পারি নি। তাদের সুযোগ দেই নি তাদের দক্ষতা দেখানোর জন্য। বর্তমান জেনারেশনের অনেকেই মুগ্ধ করেন, মুগ্ধ করেন আগের জেনারেশনের কিছু অভিনেতাও। 

এখন ভিন্নধর্মী অনেক কাজ হচ্ছে, তারা অভিনয় দক্ষতা দেখানোর সুযোগও বেশি পাচ্ছেন। কিন্তু এরকম সুযোগ খুব কমই আসে, যেখানে অভিনেতা নিজের সবটুকু নিংড়ে দেয়ার সুযোগ পান। এরকম সুযোগ আসে যখন শিবব্রত বর্মনের মতো লেখক, রবিউল ইসলাম রবির মতো নির্মাতা, ইন্তেখাব দিনারের মতো অভিনেতা একসাথে কাজ করার সুযোগ পান। তখনই কেবল এরকম আউটস্ট্যান্ডিং কিছু করা সম্ভব। আই ক্যান প্রাউডলি ব্র্যাগ নাও যে, আমাদের একজন ইন্তেখাব দিনার আছেন।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা