ঊনলৌকিক আমার দেখা বাংলাদেশের সবচেয়ে ম্যাচিওরড কন্টেন্ট। টেকনিক্যাল দিক থেকে হোক, গল্পের দিক থেকে হোক, অভিনয়ের দিক থেকে হোক- এরকম কাজ খুব কমই হয়েছে আমাদের দেশে, যেখানে খুঁত নেই বললেই চলে...

আমরা যারা একটু ফ্যান্টাসি, একটু হরর, একটু সাইন্স ফিকশন, একটু সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, একটু অলৌকিকতা পছন্দ করি তাদের জন্য বাংলাদেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি খুব কম কন্টেন্টই দিতে পেরেছে। এখনও ঘুরেফিরে আমরা ফিরে যাই 'প্রেত' এর আহমেদ রুবেল-হুমায়ূন ফরীদির কাছে, 'বিশ্বাস' এর সৈয়দ বাবুর কাছে। সেগুলোও কতকাল আগের কথা। হালের দেবীতে যেন পেতে পেতেও পেলাম না সে ভৌতিক স্বাদ, সে অলৌকিকতা। হাতে গোণা কিছু কন্টেন্ট, বড় একটা জায়গা খালি পড়ে ছিল এতদিন এই জনরার কাজে। এরপর ঊনলৌকিক আসলো। আসলো, দেখলো, জয় করলো। শিবব্রত বর্মনের গল্পগুলোকে সঙ্গী করে রবিউল আলম রবি আসলেন ৫ টি গল্প দেখাতে। আমাদের আক্ষেপ মেটাতে।

যখনই বাইরের কোন ডিস্টোপিয়ান সাই-ফাই থ্রিলার দেখেছি এতদিন, তীব্র একটা আক্ষেপ এসে খেলা করেছে যে, বাংলাদেশে কবে এই ধাঁচের কিছু দেখবো। একটু ভিন্ন ধাঁচের, দরকার নেই একদম ভৌতিক হবার, একদম ফ্যান্টাসি হবার। মাঝামাঝি কিছু, হ্যাঁ ঊনলৌকিকের মতো। ব্ল্যাক মিরর আমার অনেক পছন্দের একটা সিরিজ। আঠার মতো লেগে থেকে দেখতাম কীভাবে ভবিষ্যতে এমন অনেক কিছুই হওয়া সম্ভব যা এখন ভাবলেও রীতিমত ভৌতিক লাগে। ব্যান্ডারস্ন্যাচ আসলো, সেখানে নিজেই নির্বাচন করতে পারলাম আমি যে মূল ক্যারেক্টার কোন ডিসিশন নিবে। সেটাই গিয়ে দেখা গেল তার ভাগ্য নির্ধারন করে দিলো। এই যে অনুভূতিটা, এটার আদৌ কোন নাম আছে নাকি জানি না। একটা অদ্ভুতুড়ে জিনিস দেখার পর তৃপ্তির অনুভূতি। এই অনুভূতিটা আমি আমাদের দেশের কিছু থেকে চাইতাম। বইয়ে এমন স্বাদ আমাকে অনেকেই দিয়েছেন। এখনো মনে আছে ছোটবেলায় এক বৃষ্টির রাতে হুমায়ূন আহমেদের 'নিশীথিনী' পড়ে রীতিমত জ্বর চলে এসেছিল। মনে হচ্ছিল যে, এরকম কী আসলেও হয়? মনের ভেতর একটা ছাপ পড়ে গিয়েছিল। এই ছাপটা অস্বস্তিরও; আবার তৃপ্তিরও। ভিজুয়াল কন্টেন্টে এমন অনুভূতি পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু এবার পেলাম ঊনলৌকিকের হাত ধরে। 

প্রথম পর্বেই আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। এই গল্পে আমি দেখা পাই কবিরের। যে কীনা বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত। সাইকিয়াট্রিস্টের হেল্প নিচ্ছে কিন্তু নিজেই নিজেকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাচ্ছে। তার এই পাগলামির সল্যুশন হিসেবে আসে পাফার ফিশ। কারণ, মৃত্যুর স্বাদ মুখে নিয়ে ঘুরলেই টের পাওয়া যায় জীবনের অস্তিত্ব। মোস্তফা মন্ওয়ারের দুর্দান্ত অভিনয় পুরো স্ক্রিনের সাথে ঠেসে ধরবে দর্শককে। এমনকি বাইরের দেশের যেকোনো সাইকো ক্যারেক্টারের সাথেও চাইলে তুলনা করা কঠিন হবে। এতোটাই ব্যক্তিগত করে ফেলেছেন তিনি কবির চরিত্রটিকে। সাথে গাজি রাকায়েত, সুমন আনোয়ারের দুর্দান্ত সব ডায়লগ ডেলিভারি যথাযোগ্য সঙ্গ দিয়ে গেছে। মরিবার হলো তার স্বাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে এর টেকনিক্যাল ব্রিলিয়ান্স। এতো দারুণ কালার গ্রেডিং, প্রোডাকশন, সাউন্ড ডিজাইন যে অবাক হয়ে যেতে হয়। এতো পলিশড কাজ অনেকদিন দেখি নি স্ক্রিনে।

মরিবার হলো তার স্বাদ

দ্বিতীয় পর্বে হালের জনপ্রিয় অভিনেতা সোহেল মণ্ডলের সাথে বর্ষীয়ান অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর। গল্পটা আমিরকে নিয়ে। যে কীনা ফটোকপির দোকানে চাকরি করে। একদিন একটা বই ফটোকপি করতে গিয়ে সে আবিষ্কার করে সে বইয়ে লেখা একটা গল্পের সাথে তার জীবনের হুবুহু মিল। সে খুঁজে বের করে ঐ গল্পের লেখককে, যিনি কীনা ৩০ বছর আগে এই গল্প লিখেছিলেন। আমির তাকে তাগিদ দেয় গল্প শেষ করার জন্য, কারণ আমিরের জীবনের গল্প শেষ না হলে আমির মুক্তি পাবে না তার অতীত থেকে। কিন্তু এভাবে কি কারও জীবনের গল্প লিখে দেয়া যায়?

ডোন্ট রাইট মি! 

তৃতীয় গল্প 'মিসেস প্রহেলিকা' প্রহেলিকার জাল বুনে যায় চঞ্চল আর তিশার দুর্দান্ত অভিনয়ের বলে। মিসেস প্রহেলিকাতে আমরা দেখতে পাই তিশা তার বাস্তবতাকে স্বপ্ন বলছে আর সাইকিয়াট্রিস্ট চঞ্চল সেটাকে খণ্ডন করার চেষ্টা করছেন। তিশা বলছেন বারবার যে, যা হচ্ছে সব স্বপ্নে হচ্ছে আর চঞ্চল বলছেন সবকিছুই বাস্তবে হচ্ছে। দুজনের এই দ্বন্দ্ব কথোপকথনে স্পষ্ট হতে থাকে। তিশা তার পাস্ট ট্রমার কথা বলেন, ঘুমের ওষুধ খেয়ে কোমায় ছিলেন সেটা জানান, জানান এক অসম্ভব কথা যেটা শুনে চঞ্চল অবিশ্বাসে হেসেই ফেলেন। অদ্ভুত প্রহেলিকাময় এই পর্বে দুজনের কথোপকথনে টের পাই এক অসম্ভব অলৌকিকতা।

মিসেস প্রহেলিকা! 

কেমন হতো যদি টিভি থেকে আমাদের ড্রয়িং রুম দেখা যেত? ঊনলৌকিকের চতুর্থ পর্ব ‘হ্যালো লেডিজ’ এ প্রথমেই আমরা দেখতে পাই একটি রিয়্যালিটি শো ‘হ্যালো লেডিজ’ এর সেট। যেখানে হাউজওয়াইফরা পার্টিসিপেট করে, সে শোয়ের উপস্থাপিকার নাম সিসিলি। যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিথিলা। একশন বলার সাথে সাথেই সিসিলি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মুখস্থ স্ক্রিপ্ট বলে যায় গড়গড় করে। তারপরই হুট করে সে থেমে যায়, ক্যামেরার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তার চোখেমুখে ভয়, শঙ্কা। কী যেন দেখে ফেলেছে সে ক্যামেরায়! এরকমটা সে প্রায়ই দেখে। ইরেশ যাকের আর মিথিলার ‘হ্যালো লেডিজ’ কল্পনাকে নিয়ে যায় অন্য মাত্রায়। যে মাত্রায় সচরাচর আমরা যাই না। যে মাত্রায় অনেক কিছুই আমরা দেখি পরে কল্পনা ভেবে বলে দেই যে- দেখি নি কিছু।

হ্যালো লেডিজ! 

ঊনলৌকিকের পঞ্চম ও শেষ পর্ব ‘দ্বিখণ্ডিত’ ইন্তেখাব দিনারের এক্টিং মাস্টারক্লাস। তর্কযোগ্যভাবে এই সিরিজের অন্যতম সেরা এপিসোড। সিরিজ, সিনেমা সবকিছুতেই মাইলফলক হয়ে থাকার যোগ্য একটি এপিসোড। গল্পটা তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাধারণ এক ক্লার্ক মোশতাকের। যে কীনা পুলিশ স্টেশনে বসে এসআইয়ের সাথে কথা বলছে। বলছে হিলারি স্টেপসের কথা, এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার আগে সবচেয়ে বড় একটা দেয়াল যার জন্য অনেকেই এভারেস্ট জয় করতে পারে না। এভারেস্ট জয় করতে যাওয়া এক ব্রিটিশ একবার বলল যে হিলারি স্টেপস নাকি গায়েব হয়ে গেছে, সে গিয়ে পায় নি। অন্যদিকে শেরপারা বলছে ভিন্ন কথা, তারা বলছে হিলারি স্টেপস আগের জায়গাতেই আছে। এরকম অনেকগুলো ঘটনা সে তুলে ধরে যেখানে দুটি ঘটনা ঘটেছে একই সময়ে, কিন্তু দুটোই আসলে ঘটেছে, দ্বৈত সত্য। কেন সে এই উদাহরণগুলো দিচ্ছে, কী কী রহস্যজনক ঘটনা ঘটছে আমাদের চারপাশে, কেনই বা সে পুলিশ স্টেশনে বসে এসব বলছে, উত্তর পাওয়া যাবে সবকিছুরই। কিন্তু উত্তর পাবার পরে আবারও ভাবতে বাধ্য হই আমরা, এই মুহূর্তে আমি আবার অন্য কোথাও নেই তো?

দ্বিখণ্ডিত! 

ঊনলৌকিক আমার দেখা বাংলাদেশের সবচেয়ে ম্যাচিওরড কন্টেন্ট। টেকনিক্যাল দিক থেকে হোক, গল্পের দিক থেকে হোক, অভিনয়ের দিক থেকে হোক- এরকম কাজ খুব কমই হয়েছে আমাদের দেশে, যেখানে খুঁত নেই বললেই চলে। শুধু গল্প, অভিনয়, টেকনিক্যাল এঙ্গেল এসবেই শেষ নয়। ঊনলৌকিক সেই তৃপ্তিটা আমাকে দিয়েছে যেটা একটা অদ্ভুতুড়ে, অলৌকিক, সাইকাডেলিক কিছু দেখার পর আমি অনুভব করি। যেটা ব্ল্যাক মিরর দেখে অনুভব করেছি। ঊনলৌকিক আমাকে সে অনুভূতিটা ফেরত দিয়েছে। এই অনুভূতিটা আরও বেশি গাঢ় কারণ, আমার দেশের কন্টেন্ট। আমার দেশের অফিস ডেস্ক, রেস্টুরেন্ট, বৈঠক, টেলিভিশন, ড্রয়িং রুমে বলা এসব গল্প কেবল বয়নের জোরে কতোকিছু দেখিয়ে দিলো কল্পনা করা যায়? ধন্যবাদ ঊনলৌকিক, এ সিরিজ টু চেরিশ...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা