দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে জয় করেছেন কোটি মানুষের হৃদয়, হাজার হাজার মানুষের মুখে তুলে দিচ্ছেন খাবার... বিজয় দেবরকোন্ডা 'সফলতা'র পাশাপাশি 'মহৎ হৃদয়' এরও এক জ্বলজ্বলে উদাহরণ... 

প্রত্যেক মানুষের জীবন একেকটি উপন্যাস। যে উপন্যাসের নানা অধ্যায়। ত্যাগ, শ্রম, সফলতা, ব্যর্থতা ভরা একেকটা অধ্যায় নিয়েই একেক মানুষের জীবন-উপাখ্যান। পর্দার মানুষেরাও তার ব্যতিক্রম নন। তারাও তো রক্তমাংসের মানুষ। মঞ্চে তাদের যে ঝকমকে জীবন দেখে ক্রমশই আমরা ঈর্ষার আঁচে রক্তাভ হয়ে উঠি, সে জীবন চিরকালই কী এরকম ছিলো? নাকি, তাদেরও ছিলো বর্ণহীন একেকটা মলিন সময়ের গল্প?

সবার কথা জানি না। জানা সম্ভবও না। তবে 'অর্জুন রেড্ডি' খ্যাত সুপারস্টার বিজয় দেবরকোন্ডার জীবন-কথার প্রাথমিক অধ্যায়গুলোতে ছিলো তুমুল সব বিষাদের মেঘবিধুর আলামত। সেসব যাপিত টুকরো মেঘ হটিয়ে আজ যে তিনি সফল, তার পেছনে কতটা ঘাম-রক্ত-শ্রম দিয়েছে আত্মাহুতি, সে নিয়ে বিস্তর গবেষণা চাইলে হতেই পারে৷ 

রূপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মানোর পক্ষপাতদুষ্ট ভাগ্য পান নি তিনি। জন্মেছিলেন তেলেঙ্গানার আচামপেটের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে। বাবা গোবর্ধন রাওয়ের ছিলো অভিনয়ের নেশা। তিনি মঞ্চের মানুষ হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেন নি। চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ছোটখাটো কিছু চরিত্রে অভিনয় করার পরে বুঝেছিলেন,  এখানে ঠিক খাপ খাচ্ছেন না। তবুও, মঞ্চকে ছাড়তে চাইলেন না। অভিনয় ছেড়ে পরিচালনা শুরু করলেন। কিন্তু সেখানেও ঠিক সড়গড় হলো না। পুরোটাই নিস্ফল প্রচষ্টার এক উদাহরণ হয়ে থেকে গেলো মহাকালের গর্ভে। ব্যর্থ মনোরথে তিনি বাপ-দাদার পুরোনো আদ্যিকালের পেশা, কৃষিকাজেই ফিরলেন। 

কিন্তু, জীবনযুদ্ধে নিজে পরাজিত হলে কী হবে, ভেতরে ভেতরে একটা স্বপ্ন রয়েই গিয়েছিলো তাঁর। নিজে পারেন নি, কিন্তু চেয়েছিলেন ছেলে অভিনেতা হোক। নাম কুড়োক। সুনাম হোক। তাই বিজয়ের উপর 'বাবার অজেয় স্বপ্ন' পূরণ-জনিত প্রত্যাশার জগদ্দল পাথর আসীন হলো খুব অল্পবয়সেই। অবশ্য, বিজয় নিজেও অভিনেতা হতে চাইতেন৷ সেজন্যেই, হায়দ্রাবাদে স্কুল, কলেজের গণ্ডি পেরোনোর পর দুয়েকটা ছোটখাটো নাটকে অভিনয়ও শুরু করেন। এ সময়টা তীব্র কায়ক্লেশের। বিজয়ের বাবা ততদিনে বিজয়কে জানিয়ে দিয়েছেন, ছেলের পেছনে আর টাকা দিতে পারবেন না তিনি। সে সংস্থানও তার নেই। ছেলে যেন নিজের পথ নিজেই খুঁজে নেয়।

কলেজে থাকতেই টুকটাক অভিনয় শুরু করেছিলেন! 

বিজয়ের তখন দিশেহারা হওয়ার অবস্থা। তিনি তখন প্রচণ্ডবেগে আঁকড়ে ধরেন টুকটাক যা অভিনয় ছিলো হাতের নাগালে, সবগুলোকে। পেট চালাতে হবে তো। পেটের ধান্ধায় নাটকের যেকোনো চরিত্রে ডাক পড়লেই হাজির হয়ে যেতো বিজয়। এভাবে সংগ্রামমুখর বেশ কিছুদিন কাটানোর পরে, একদিন সে ডাক পায় বড় পর্দার। 'নুভিলা' নামের এক কমেডি সিনেমার মাধ্যমে বড়পর্দায় অভিষেক হয় তার। যদিও তিনি প্রধান চরিত্রে ছিলেন না। অনেকের পাশাপাশি ছিলেন গড়পড়তা এক চরিত্র। আলাদা করে তার কোনো অস্তিত্ব প্রকাশিত হয় না এ সিনেমায়। পরবর্তীতে আরো কিছু সিনেমা করেন। তবে কোনোটাতেই উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স হয় না। বিজয় দেবরকোন্ডা অচেনাই থেকে যান। পাদপ্রদীপের আলো তখনও তার কাছে অধরা।

'পেল্লি চপুলু' দিয়েই জনপ্রিয়তা শুরু তার! 

তবে ভাগ্যদেবী বেশিদিন নির্দয় থাকেন না। ২০১৬ সালে 'পেল্লি চপুলু' নামের এক সিনেমায় বিজয়ের অভিনয় প্রশংসিত হয়। জনস্রোতে আলাদা করে চেনার মত এক পরিচিতি তৈরী হয় তার। একটা প্রবাদ আছে, 'ঈশ্বর যখন কিছু দেন, দু'হাত উপুড় করে দেন।' সেটাই লক্ষ্য করি বিজয়ের বেলায়। পেল্লি চপুলু'তে তার চরিত্রের প্রশংসার রেশ কাটতে না কাটতেই পরের বছরে মুক্তি পায় 'অর্জুন রেড্ডি।' দুর্দান্ত অভিনয়ে গোটা উপমহাদেশেই এক নামে পরিচিত হয়ে যান তিনি। বলিউডে 'কবির সিং' নামে রিমেক ভার্সন হয়। যে সিনেমাতেও আসার কথা ছিলো তার। 'অর্জুন রেড্ডি'তে তার দুর্দমনীয় অভিনয় এতটাই অন্যরকম ছিলো, তা নিয়ে কথা হয় আজও। 

'অর্জুন রেড্ডি' সিনেমায় করেছেন দুর্দান্ত অভিনয়! 

বিজয় দেবরকোন্ডা এখন জনপ্রিয়, ব্যস্ত, পাদপ্রদীপের তলে আশ্রয় পাওয়া মানুষ। তাও নিজের অতীত ভুলে যাননি তিনি। তাই এখনও পা মাটিতেই রেখেছেন। কায়ক্লেশে বড় হয়েছেন বলেই, দুস্থ মানুষদের ব্যথা আলাদাভাবে অনুভব করেন তিনি। সে কারণেই নানারকম সামাজিক সংগঠনের সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। বিজয়ের নিজেরও একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে। সে সংগঠন নানা সমাজ-সংস্কারমূলক কাজে বরাবরই সরব। এই মহামারীর মধ্যেও তাঁর সংগঠন এক কোটি সত্তর লাখ টাকা খরচ করে বহু পরিবারের দু'বেলা অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। মহামারী শেষ হয় নি এখনও, বিজয়ের সংগঠনের কাজও তাই এখনো চলছে দুর্বার বেগে।

পর্দার সামনে তিনি দুর্দান্ত নায়ক, তা সবার জানা। কিন্তু পর্দার নেপথ্যে তিনি যে লালন করেন ভীষণ কোমল জীবনবোধের এক গল্প, তা জানলে, এই মানুষটির প্রতি সম্মানই যেন বেড়ে যায় অনেকটা। নিজের বাবার স্বপ্ন পূরণ করেছেন, দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে জয় করেছেন কোটি মানুষের হৃদয়, হাজার হাজার মানুষের মুখে তুলে দিচ্ছেন ভাত...বিজয় দেবরকোন্ডা 'সফলতা,'র পাশাপাশি 'মহৎ হৃদয়' এরও এক জ্বলজ্বলে উদাহরণ।

এই মানুষটির জন্যে শ্রদ্ধা ও শুভকামনা রইলো। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা