বীর দাসের এই মনোলোগ ভাইরাল হওয়ার পরেই তার ললাটে যেন নেমে এলো দুর্ভোগ। তাকে পাকিস্তানী চর বানানো হলো। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হলো। তিনি আমেরিকার দালাল হয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্যে দেশের সম্মান বিকিয়ে দিয়েছেন, এমন কথা বলা হলো। চেতন ভগতের মতন জনপ্রিয় লেখকও বললেন- নিজের মা খারাপ হলেই কি আমি সে মায়ের বদনাম প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে করবো? এভাবেই ছয় মিনিটের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যেন কেঁপে উঠলো গোটা দেশ...

I come from an India that has the largest working population under 30 on the planet but still listens to 75 year old leaders with 150 year old ideas. 

গত দুই সপ্তাহ ধরে ভারতে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি কে, এরকম প্রশ্নের জবাবে কোনো ভাবনাচিন্তা ছাড়াই অধিকাংশ মানুষ যে নামটি বলবে, সে নাম- বীর দাস। ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেহরাদুনে জন্ম নেয়া এই স্টান্ডআপ কমেডিয়ানই এখন ভারতের সবচেয়ে আলোচিত, ক্ষেত্রবিশেষে সমালোচিত একজন মানুষ। গত বারোই নভেম্বর ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারে 'আই কেম ফ্রম টু ইন্ডিয়াস' নামে যে বোমা তিনি ফাটিয়েছেন, তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি যে রাতারাতিই টক অব দ্য টাউন হয়ে যাবেন, তা একরকম নিশ্চিতই ছিলো। কিন্তু তার ছয় মিনিটের এই বক্তব্য যে এভাবে কাঁপিয়ে দেবে ভারতবর্ষকে বা উপমহাদেশকে, তা কি তিনি নিজেও কল্পনা করেছিলেন?

ছয় মিনিটের এই মনোলোগে দুই বিপরীত বৈশিষ্ট্যের ভারতের যে বর্ণনা বীর দাস দিয়েছেন, তা নির্জলা সত্যিও। বৈপরীত্যের পারস্পরিক আখ্যানে তিনি প্রথমে এমন এক ভারতের কথা বলেছেন, যে ভারত উদার। আবার, বিপরীতে, তিনি এমন এক ভারতের বর্ণনা করেছেন, যে ভারত নিষ্ঠুর। যেখানে এক ভারত নারীশক্তির পূজা করে,  আরেক ভারত রাতের আঁধারে নারীর উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। কৌতুকের আড়ালে ক্রমশই বীর দাস যেভাবে ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কার'কে কটাক্ষ করেছেন, তা মুগ্ধ করেছে অগুনতি মানুষকে। এক ভারত নিয়ে হতাশা এবং আরেক ভারত নিয়ে মুগ্ধতার বার্তা ছড়িয়ে শেষটায় তিনি সমগ্র ভারত নিয়েই হয়েছেন আশাবাদী।

এই ভিডিওটা যখন প্রথমবার দেখি, মুগ্ধ হয়েছিলাম শব্দচয়নে এবং পাঞ্চলাইনের যথাযথ প্রয়োগে। অনেকেই বলেন- দি লোয়েস্ট ফর্ম অব আর্ট ইজ হিউমার। সে বাক্যকে কটাক্ষ করে বীর দাসের এই মনোলোগ যেন প্রমাণ করে- চাইলে বিদ্রুপের আড়ালেও গভীর ক্ষতের আঘাত দেয়া যায়। চাইলে কৌতুকের মধ্যেও আনা যায় প্রপার রিসার্চ, জেনারেট করা যায় আইডিয়া।

আই কেম ফ্রম টু ইন্ডিয়াস! 

ভেবেছিলাম, এই মনোলোগ দেখার পরে মানুষজন যারপরনাই প্রশংসা করবে বীর দাসের। কারণ, এ মনোলোগ প্রশংসা পাওয়ারই যোগ্য। মিথ্যে কথার বেসাতির বদলে যে শব্দগুলোকে আনা হয়েছে এখানে, যে কটাক্ষে বিদ্ধ করা হয়েছে সমাজের নিরেট খুলিকে, তা আপাদমস্তক প্রাসঙ্গিক। এ কথাগুলো তো সাধারণ মানুষের কথাও। এখানে যে কথাগুলো বলা হয়েছে, সেখানের একটি শব্দকেও ছাঁটাই করার উপায় নেই মোটেও। এতটাই যথাযথ পুরোটা। অথচ এই মনোলোগ ভাইরাল হওয়ার পরেই বীর দাসের কপালে যেন নেমে এলো দুর্ভোগ। তাকে পাকিস্তানী চর বানানো হলো। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হলো। তিনি আমেরিকার দালাল হয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্যে দেশের সম্মান বিকিয়ে দিয়েছেন, এমন কথা বলা হলো। চেতন ভগতের মতন জনপ্রিয় লেখকও বললেন- নিজের মা খারাপ হলেই  কি প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে আমি সে মায়ের বদনাম করবো? পুরো দেশই যেন ঠিক এভাবে বহু খণ্ডে খণ্ডিত হয়ে গেলো এক মনোলোগকে কেন্দ্র করে। 

অদ্ভুত লাগলো পুরো বিষয়টা। আবার পরবর্তীতে অদ্ভুত লাগলোও না। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা 'হীরক রাজার দেশে'র 'যন্তরমন্তর ঘর' এ মগজধোলাই হওয়া মানুষগুলোর কথা মনে পড়লো। বীর দাসের এই মনোলোগে প্রতিক্রিয়াশীল মানুষদের অধিকাংশেরই মগজ বহু আগে থেকেই হয়ে গিয়েছে ধোলাই। কখনো রাজনীতি, কখনো ধর্ম কিংবা কখনো বা উগ্র জাতিবোধ তাদেরকে রূপান্তরিত করেছে বোধহীন নির্বোধে। বালুতে মুখ গুঁজে উটপাখির মতন বাঁচতে বাঁচতে তারা যে স্বাভাবিক চিন্তার ক্ষমতাও হারিয়েছে, সেটিই যেন প্রমাণিত হয়েছে আরেকবার।

এই ঘটনার পরবর্তীতে বীর দাস '৪৯তম অ্যামি অ্যাওয়ার্ড' এর কমেডি সেকশনে 'বীর দাসঃ ফর ইন্ডিয়া' শো এর জন্যে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। যদিও শেষপর্যন্ত তিমি বিজয়ী হতে পারেননি। কিন্তু তবুও এ ঘটনা নিয়েও জলঘোলা হয়েছে বিস্তর। অ্যামি অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার জন্যে দেশকে অপমান করলে, অথচ শেষপর্যন্ত সেটিও পেলে না... এরকম তীর্যক মন্তব্যও ঠারেঠুরে করেছেন অনেকে। এক মনোলোগ যে তাকে এরকম বেহাল দশায় ফেলবে, তা হয়তো তিনিও কল্পনা করেননি। সত্যি কথা বলার জন্যে এত শ্লেষাত্মক মন্তব্য সইতে হবে, সেটিও বোধকরি ছিলো তার ভাবনার অতীত।

ছয় মিনিটের এক মনোলোগে প্রতিক্রিয়াশীলদের গালে চপেটাঘাতই করেছেন তিনি! 

পারস্যের কবি জালালউদ্দিন রুমি বলেছিলেন- 

Raise your words, not voice. It is rain that grows flowers, not thunder. 

এই উক্তিটুকু মেনেই আমরা বুঝতে পারি, যারা এরকম আক্রমনাত্মক হচ্ছেন, তাদের এটুকুই সম্বল। কারণ, কথাতেই আছে- অসারের তর্জনগর্জন সার৷ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটাই, বীর দাস যে কথাগুলো বলেছিলেন, তা যেমন ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা উপমহাদেশের যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য৷ এবং যুক্তি দিয়ে এই কথাগুলোর খণ্ডন কারো পক্ষেই সম্ভব না। সেজন্যেই এই  অসুস্থ আক্রমণ। তবুও যতই আক্রমন কিংবা ক্লেদাক্ত বাক্য আসুক, অবশেষে বীর দাসের মত কেউ যে বিশ্বমঞ্চে 'হাসির আড়ালের এই নীরবতা'কে নিয়ে এলো সম্মুখে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাকে আড়াল করে সুখী হওয়ার অভিনয় না করে সমস্যাকে সামনে নিয়ে এলেই যে অর্ধেকটা সমাধান হয়ে যায় সমস্যার, সে বোধোদয় হোক সবার। 'আই কেম ফ্রম টু ইন্ডিয়াস' হোক অনেকের বিবেক-শুদ্ধির হাতিয়ারও। এটাই প্রত্যাশা। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা