গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরের কল্যানে একটা কথা আমাদের জানা হয়ে গেল, সিনেমা শুধু ভালোই করে না। অনেকক্ষেত্রে হিতে বিপরীতও করে । সিনেমা চাইলে যাবজ্জীবন অভিশাপেও মানুষকে ডুবিয়ে দিতে পারে। 'গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর' সেটারই হয়তো প্রজ্জ্বল, প্রকাণ্ড এক উদাহরণ...

বলা হয়ে থাকে, দুই শ্রেণির দর্শক আছে পৃথিবীতে। এক- যারা 'গডফাদার ট্রিলোজি' দেখেছেন। দুই- যারা 'গডফাদার ট্রিলোজি' দেখেননি। সেভাবে দ্বিখণ্ডিত করা যায় বলিউডের দর্শকশ্রেণিকেও। বলা যেতে পারে- বলিউডের সিনেমাপ্রেমীদেরও দুই জাত। এক- যারা কাল্ট ক্লাসিক 'গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর' দেখেছেন। দুই- যারা দেখেননি। অনুরাগ কাশ্যপের এই অতিমানবীয় অ্যাকশন ক্রাইম কাজটি দেখেননি অথবা নাম শোনেন নি, এমন সিনেমাপ্রেমী খুঁজে পাওয়াও তো অসম্ভব কাজ! 

ধানবাদ, যাকে ডাকা হয় ভারতের 'কয়লার রাজধানী' নামে, সেই ধানবাদের এক মফস্বল শহর- ওয়াসিপুর, সে ওয়াসিপুরের কয়লা মাফিয়াদের রামরাজত্ব, পাওয়ার স্ট্রাগল, লোকাল পলিটিক্স, সোশ্যাল প্যারাডক্স নিয়ে যে দুর্দান্ত নির্মাণ, এবং তাতে মনোজ বাজপেয়ী, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী, পঙ্কজ ত্রিপাঠী, হুমা কুরেশি, রিচা চাড্ডা সহ বাকিদের যে তুখোড় অভিনয়...সিনেমাপ্রেমীরা চাইলেও 'গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর' সিরিজকে ভুলতে পারবেন না সহজে। সেটি সম্ভবও না। 

তুমুল প্রশংসিত এই নির্মাণে অন্যান্য বহুকিছুর তুলনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছিলো 'ওয়াসিপুর' গ্রাম।  এমনটা আমরা অনেকেই দেখেছি, কোনো নির্মাণ জনপ্রিয় হলে, সেই নির্মাণ যেখানে চিত্রায়িত হয়েছে, সে জায়গাটিও জনপ্রিয় হয়ে যায়। সত্যজিৎ রায়ের অজস্র সিনেমার সেট এখনও মানুষ মনে রেখেছে, সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছে। মানুষ নিয়মিত সেগুলো দেখতে যায়। সময়ের ফেরে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানেই পরিণত হয়েছে তা। বলিউডের অজস্র কালজয়ী সিনেমার সেট নিয়েও এমন নজির দেখা যায়। সে হিসেবে আগ্রহপোকা মাথায় কিলবিল করতেই পারে, গ্রে ম্যাটারে প্রশ্ন আসতেই পারে- 'গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর' সিনেমার সেই রক্ত,বুলেট, বিপদে আচ্ছন্ন জনপদ, 'ওয়াসিপুর' এর কী অবস্থা এখন? কেমন আছে সেখানের মানুষেরা? এই সিনেমার পরে তাদের জনজীবন কতটুকু পাল্টেছে?  ক্রমে ক্রমে আমরা মূল লেখায় ঢুকছি। গৌরচন্দ্রিকার পালা শেষ। 

ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচী থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরে যে ওয়াসিপুর, সেখানে আশির দশকে জন্ম হয় এক মানুষের, যার নাম জিশান কাদরি, যিনি 'গ্যাংস অব ওয়াসিপুর' এর লেখক। তার লেখা গল্পের সিনেমারূপ যখন ২০১২ সালে মুক্তি পায়, স্বভাবতই বিক্ষুব্ধ হয় ওয়াসিপুরের স্থানীয় মানুষজন। এ বিক্ষোভের পেছনে সঙ্গত কারণও ছিলো। যেভাবে ওয়াসিপুরকে তুলে আনা হয়েছে এ সিনেমায়,তা তীব্র ভীতিকর, আতঙ্কের এবং ত্রাসের। সেখানকার অধিবাসীদের মতে, ওয়াসিপুর মোটেও এতটা ভয়ঙ্কর না। সিনেমার 'মশলা' বাড়ানোর জন্যে মনগড়া সব গল্প লেখা হয়েছে এই জনপদকে কেন্দ্র করে, অনেকে তখন এমন মন্তব্যও করেন। এই বিশেষ দিক বিবেচনায় বিস্তর সমালোচনাও হয় সিনেমাটির। এসব সমালোচনার বিপরীতে লেখক জিশান কাদরি তখন দিয়েছিলেন ধারালো এক জবাব, তিনি বলেছিলেন-

ওয়াসিপুর নিয়ে যা লিখেছি তার বিশভাগ হয়তো কল্পনা৷ কিন্তু আশিভাগই সত্যি! 

লেখকের এমন রাখঢাকবিহীন মন্তব্য এবং সিনেমার অমন ভীতিকর দৃশ্যায়নের পরে ভারতের বাকি প্রদেশের মানুষেরা একটু ভয়ের চোখেই দেখা শুরু করে ধানবাদের ওয়াসিপুরকে। আমরা যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে খানিকটা সমঝে চলি, অনেকটা সেরকম। এবং মানুষের এই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব পড়ে সেখানকার অধিবাসীদের সামাজিক জীবনেও। 'মেয়েপক্ষ' ওয়াসিপুরের বাসিন্দা শোনার পরে 'ছেলেপক্ষ' বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙ্গে দেয়ার মতন ঘটনা ঘটে। এই সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পর অনেক মানুষ 'ওয়াসিপুর' এ বসবাসরত তাদের আত্মীয়দের সাথে সম্পর্কচ্যুতি ঘটান। 

শহর 'ওয়াসিপুর' 

এই গ্রাম থেকে অনলাইনে খাবার বা প্রোডাক্ট অর্ডার করলে ডেলিভারিম্যানরা এখানে আসতে চায় না। অনেক জোরাজুরির পরে হয়তো কোনো কোনো 'ডেলিভারি বয়' আসেন। তবে তারাও আসেন চোখেমুখে ভয়ের প্রগাঢ়, প্রকট আভা মাখিয়ে। এখানের বাসিন্দাদের ব্যাংক থেকে লোন দেয়া হয় না। যখনই ব্যাঙ্কের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেখেন, ঋণের আবেদনকারী ওয়াসিপুরের অধিবাসী, তারা অনেকক্ষেত্রেই আবেদন নাকচ করে দেন। যদিও অনেক ব্যাংকই এই অভিযোগ একবাক্যে নাকচ করার চেষ্টা করেন। তবুও এ অভিযোগ যে একেবারেই অমূলক না, তাও নানা ঘটনায় বহুসময়ে নানাভাবে প্রমাণিত হয়েছে 

সমস্যা শুধু এখানেই না। স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রেও এই এলাকার মানুষকে রাখা হয় ভিন্ন যাচাই-বাছাইয়ে। এই এলাকার শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হতে হয় ক্লাসরুমের বাকি সবার কটাক্ষ, বিদ্রুপ, উপহাসেরও। ওয়াসিপুরের ছাত্র-ছাত্রীদের বাদবাকি শিক্ষার্থীরা 'অচ্ছুৎ' করে রাখার মতন উদাহরণও আছে অজস্র। এরকম বহুবিধ সামাজিক সমস্যায় নাকাল হয়ে এখানের অনেক মানুষই ক্রমশ এই অঞ্চল থেকে নিজেদের পাততাড়ি গুটিয়েছেন, ঘাঁটি গেড়েছেন অন্য আবাসে। যে আবাসে 'ওয়াসিপুর' নাম নেই। যেখানে এলাকার নামের কারণে বৈষম্যের স্বীকার হওয়া নেই।

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, ধানবাদের এই আলোচিত মফস্বলের মানুষজন অতীতে অজস্রবার নানাবিধ অপরাধে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। এখানের ভৌগোলিক অবস্থান, এখানের অধিবাসীদের কর্মকাণ্ড, এখানে স্থানীয় গডফাদারদের ত্রাস... সবমিলিয়ে এই এলাকাকে একসময়ে "ছোটা পাকিস্তান' নামেও ডাকা হয়েছে। কিন্তু সেসব দিন গত হয়েছে বহু আগে। এই অঞ্চলের অপরাধের হার এখন কম। আগের সেই মাফিয়া-উৎপাতও এখন তুলনামূলক পড়তির দিকে। কিন্তু বিগত অতীতের পাপের সেই অপবাদই যেন ঘোচেনা মোটেও। ধানবাদের যেকোনো এলাকাতে এখনও কোনো খুন-জখম-সহিংসতার ঘটনা ঘটলে সংবাদপত্রের শিরোনামে চটকদার মশলামুড়ির মতন 'গ্যাংস অব ওয়াসিপুর' নাম চলে আসে। পত্রিকার কাটতি বাড়ে। কিন্তু এখানের মানুষেরা ক্রমশই হয় পর্যুদস্ত, নাকাল, বিব্রত। 

এই সিনেমার নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপও বিষয়টি বোঝেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারও কিছু করার নেই এখানে। তিনি যখন ওয়াসিপুরকে নিয়ে এই সিনেমা বানিয়েছিলেন, তখন ওয়াসিপুরে আদতেই বিস্তার করছে ত্রাসের রাজত্ব। কিন্তু এই সিনেমা যে এভাবে সময়কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে মানুষকে আলোড়িত করবে, 'গ্যাংস অব ওয়াসিপুর' যে এভাবে লার্জার দ্যান লাইফ হয়ে যাবে, তা হয়তো নির্মাতা নিজেও ভাবেননি। বলিউডের অন্যতম কাল্ট ক্লাসিক এ সিনেমায় অতীতের 'ওয়াসিপুর' এর পোর্ট্রেয়াল দেখে সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনা যদি এখনও প্রভাবিত হয়, তার রেশ যদি পড়ে এখনকার মানুষদের বাস্তব জীবনে, সেখানে অনুরাগ কাশ্যপ শুধুমাত্র ক্ষমাপ্রার্থনা এবং অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া আর কীই বা করতে পারেন! এ সিনেমার যে গগনচুম্বী প্রভাব, ব্যক্তি অনুরাগ কাশ্যপও তো তার কাছে বিলকুল নস্যি! এ সিনেমার দোর্দণ্ডপ্রতাপের সাথে তিনি পেরে উঠবেনও বা কিভাবে? 

'গ্যাংস অব ওয়াসিপুর' সিনেমা!

এক 'গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর' যেভাবে পালটে দিয়েছে ওয়াসিপুরের মানুষদের রোজকার দিনলিপি, তা ভাবলে ব্যাপক বিস্ময়বোধে আক্রান্ত হতে হয়। আমরা জানি,  সিনেমা-মাধ্যম মানুষের মানসিকতা, চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ পালটাতে পারে। সমাজব্যবস্থায় ছোটখাটো পরিবর্তনও আনতে পারে। কিন্তু বিশেষ কোনো সিনেমা যে একটা গোটা এলাকার মানুষের জীবনের 'অআকখ' পর্যন্ত পালটে দিতে পারে, এ সিনেমা মুক্তির আগে সেটা হয়তো জানা ছিলো না কারোরই। 'গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর' এর মাধ্যমেই সিনেমা-মাধ্যমের নিরঙ্কুশ শৌর্যের এহেন বিরল নিদর্শনের হদিশ পায় মানুষ।

বছরের পর বছর চলে গেলেও বিশেষ কোনো সিনেমা যে 'জগদ্দল ভূত' এর মতন চেপে বসে থাকতে পারে বিশেষ কোনো এলাকার মানুষের ললাটে, সেটাও প্রকট হয় এ সিনেমার ক্ষেত্রে। আরও কতকাল এভাবে এই অপবাদ নিয়ে ঘুরবে এ এলাকার মানুষজন, তা জানা নেই কারো। তবে এ সিনেমার কল্যানে একটা কথা সবারই জানা হয়ে যায়, সিনেমা শুধু ভালোই করে না। অনেকক্ষেত্রে হিতে বিপরীতও করে । সিনেমা চাইলে যাবজ্জীবন অভিশাপেও মানুষকে ডুবিয়ে দিতে পারে। 'গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর' সেটারই হয়তো প্রজ্জ্বল, প্রকাণ্ড এক উদাহরণ!  


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা