লিরিকের অর্থ বোঝেন না, কোন ভাষার গান সেটাও জানেন না, তবু পাগলের মতো শুনে চলেছেন অজস্র মানুষ৷ ইউটিউবে 'মানিকে মাগে হিতে'র ভিউ বাড়ছে হু হু করে, ফেসবুক ভেসে যাচ্ছে এই গানের কভারে, টিকটকে গানটির সঙ্গে নেচে ভিডিও আপলোড করছে হাজারো ইউজার...

'মানিকে মাগে হিতে 
মুদলে নুরা হ্যাগুম ইয়াবি... 
আবিলেবি... 
নেরিয়ে নম্বে নাগে 
মাগে নেট এরা মেহা ইয়াবি... 
সিহি বেবি...' 

অর্থ তো দূরের কথা, শব্দগুলোও পরিস্কার বোঝার কথা নয় এই অঞ্চলের কারো। তবু এই লাইনগুলো মাথার মধ্যে রিপিটেটিভ মুডে বেজে যাচ্ছে দু'দিন ধরে। গানটার সুরের মধ্যে অদ্ভুত একটা মাদকতা আছে, হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার বাঁধির আওয়াজের মতো আকর্ষণ করে গায়িকার কণ্ঠস্বরও। শ্রীলঙ্কা ছাপিয়ে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান কিংবা সুদূর ইউরোপ-আমেরিকায় এই গানের বিস্তার তো এমনি এমনি হয়নি! 

আঠাশ বছরের এই তরুণীর নাম ইয়োহানি দিলোকা ডি সিলভা। শ্রীলঙ্কায় ফিমেল র‍্যাপার হিসেবে তার জনপ্রিয়তা আছে। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তা যে তুঙ্গস্পর্শী হয়ে যাবে, সেটা কল্পনায় ছিল না খোদ ইয়োহানিরও। মাস চারেক আগে যখন 'মানিকে মাগে হিতে' শিরোনামের গানটার রেকর্ডিং করছিলেন, তখন দৃষ্টিসীমায় ছিল বাস্তবতা, এক মিলিয়ন ভিউ অনেক- এমনটাই প্রত্যাশা ছিল হয়তো। 

কিন্তু মুক্তির মাস তিনেক পর এসে সব ওলট পালোট করে দিলো গানটা। আচমকা ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল এই গান! লিরিকের অর্থ বোঝেন না, কোন ভাষার গান সেটাও জানেন না, তবু পাগলের মতো শুনে চলেছেন অজস্র মানুষ৷ ইউটিউবে ভিউ বাড়ছে হু হু করে, ফেসবুক ভেসে যাচ্ছে এই গানের কভারে, টিকটকে গানটির সঙ্গে নেচে ভিডিও আপলোড করছে হাজারো ইউজার। ঘটনা দেখে ইয়োহানি আর তার সঙ্গী সাথীরা মোটামুটি স্তব্ধ। 

ইয়োহানির গাওয়া গান ভাইরাল হয়েছে গত এক সপ্তাহে

তবে 'মানিকে মাগে হিতে' গানের জনপ্রিয়তা এখানেই শেষ হয়নি। খোদ বলিউড সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন টুইট করেছেন ইয়োহানির গাওয়া এই গান নিয়ে, লিখেছেন, এই গান লুপে রেখে একটানা শুনছেন তিনি। পরিণীতি চোপড়া তো গেয়েই ফেলেছেন গানটা! তামিল, তেলেগু, বাংলা আর হিন্দিতেও এই গানের আলাদা আলাদা ভার্সন রেকর্ড করা হয়েছে। কেউ আবার অন্য এক বা একাধিক গানের সঙ্গে ক্রসওভার করছেন মানিকে মাঙ্গে হিতে-কে। শোনা যাচ্ছে, এই গান ভাইরাল হওয়ার পর ইয়োহানির কাছে নাকি বলিউডের অফারও এসেছে! 

দর্শকেরাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছেন এই গান। সিংহলিজ ভাষার সঙ্গে বাংলা বা হিন্দির দূরত্ব ঘুচে গেছে এই গানের মাধ্যমে। এমনিতে শ্রীলঙ্কান বা দক্ষিণ ভারতীয় রান্না বাঙালির ঠিক হজম হয় না, প্রতিটা পদেই নারকেল আর নারকেল তেলের অধিক ব্যবহারের কারণে গোটা প্যাকেজটা বিস্বাদ মনে হয় বেশিরভাগের কাছেই। কিন্তু ইয়োহানির এই গানের বেলায় কিন্তু রসনার ব্যাপারটা মেলেনি। এই গানে কী তরকারি আছে, মশলা কি ব্যবহার করা হয়েছে, সেসবের খোঁজ নেয়ার দরকারও মনে করছে না কেউ। পরিবেশনের সৌন্দর্য্য আর রান্নার স্বাদেই বিমোহিত হয়েছে সবাই। 'মানিকে মাগে হিতে' তাই বাংলাদেশ আর কলকাতা- দুই জায়গাতেই হিট!

‘মানিকে মাগে হিতে’ লাইনটির বাংলা অর্থ হলো ‘তুমি আমার চোখের মণি’। প্রেমিকার অভিমান ভাঙানোর চেষ্টায় রত এক বিপন্ন প্রেমিকের আকুতি ফুটে উঠেছে এই গানে। যদিও এই গানের মূল গায়ক ইয়োহানি নন, গানটি প্রথম গেয়েছিলেন লঙ্কান র‍্যাপার সথীশন রাথনায়কা। গত বছর করোনার লকডাউন চলাকালে ঘরে বসেই এই গান রেকর্ড করেছিলেন সথীশন। গানের কথা আর সুর দুটোই তার। 

এবছরের মে মাসে সথীশনই ইয়োহানিকে দিয়ে নতুন করে রেকর্ড করিয়েছিলেন 'মানিকে মাগে হিতে'৷ ইউটিউবে মুক্তির পর শুরুর দিকে অ্যাভারেজ রেসপন্স পেয়েছিল এই গান। কিন্তু আচমকাই গত সপ্তাহ থেকে নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়ে গানটি। ইউটিউবে প্রতি সেকেন্ডে গানের ভিউজ বেড়ে চলেছে। এখনও পর্যন্ত ৮ কোটি বার দেখা হয়েছে গানটি৷ 

ইয়োহানি ডি সিলভা

মানিকে মাগে হিতে-র ভাইরাল হবার পেছনে ইয়োহানির গায়কীর পাশাপাশি তার সৌন্দর্য্যকেও কারণ বলেছেন অনেকে। গানের মতোই ইয়োহানির হাসি ও মনোমুগ্ধকর চাউনি কোটি ভক্তের হৃদয় কেড়েছে- এই কথা অস্বীকারের উপায় অবশ্য নেই। তবে তাতে ইয়োহানির প্রতিভাকে অবমূল্যায়নই করা হবে। ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল ইউটিউবার হিসেবে। পেটাহ ইফেক্ট নামের একটি রেকর্ড লেভেল তাকে প্রথম কাজের সুযোগ করে দিয়েছিল। এরপর থেকে ইয়োহানি এগিয়েছেন শুধু সামনের দিকে। অনেকটা স্বপ্নের মতোই তার পথচলা। 

ইয়োহানির জন্ম কলম্বোতে, ১৯৯৩ সালে। বাবা ছিলেন আর্মি অফিসার। ইংরেজি মাধ্যমে অর্ডিনারি ও অ্যাডভান্স লেভেল স্টাডিজ শেষ করে লজিস্টিক ম্যানেজমেন্ট বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব শেষ করেন ইয়োহানি। পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ায় কয়েক বছর অবস্থান করেছেন এই তরুণী, ভেবেছিলেন দেশের বাইরেই থিতু হবেন, ক্যারিয়ার গড়বেন। কিন্তু পরিবারের টানে ফিরে এলেন শ্রীলঙ্কায়। কিছুদিন চাকরি করেছেন সাপ্লাই চেইন ম্যানেজার হিসেবে। পাশাপাশি চালিয়ে গিয়েছেন র‍্যাপ গানের চর্চাও, নিজের ভালোবাসার জায়গাটাকে বিলীন হতে দেননি কখনও। 

তবে মোটাদাগে প্রফেশনাল শিল্পী হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয় ২০১৯ সালে, পাকাপাকিভাবে শ্রীলঙ্কায় ফেরার পর। এর আগেই ইউটিউব চ্যানেল খুলে গান আপলোড করা শুরু করেছিলেন ইয়োহানি, তার গাওয়া একটি গান বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছিল। ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে তার, আসতে থাকে ব্র‍্যান্ড এন্ডোর্সমেন্টের প্রস্তাব। শ্রীলঙ্কার জনপ্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে কনসার্টে অংশ নেন তিনি, দেশের বাইরে থেকেও কনসার্টের জন্য ডাক পড়ে তার। 

শ্রীলঙ্কায় ইয়োহানিকে ডাকা হচ্ছে 'র‍্যাপ প্রিন্সেস' নামে

গত তিন বছরে একের পর এক কনসার্ট এবং সিঙ্গেল গান তাকে জায়গা করে দিয়েছে শ্রোতাদের হৃদয়ে। তবে এবার দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আঙিনায় তার এই পরিচিতি 'মানিকে মাগে হিতে' গানের সৌজন্যেই। সাধারণ র‌্যাপাররা এত সুরেলা কণ্ঠের অধিকারি হন না, কিন্তু ইওহানি সেই জায়গায় একেবারে আলাদা, একদম অনন্যা। এখন তাকে ডাকা হচ্ছে শ্রীলঙ্কার 'র‍্যাপ প্রিন্সেস' নামে। ফেসবুক, টুইটার আর ইন্সটাগ্রামে হু হু করে বাড়ছে তার ফলোয়ার। ইউটিউবের সাবস্ক্রিবশন সংখ্যাও রাতারাতি বেড়ে আকাশচুম্বী। বলিউড থেকে আসা প্রস্তাবের কথা তো বলা হলোই। গান ভাইরাল হবার পাশাপাশি ইয়োহানিও এখন তুমুল জনপ্রিয় এক ব্যক্তিত্ব৷ 

বলা হয়, সঙ্গীতের নাকি কোন ভাষার বাঁধন নেই, নেই কোন নির্ধারিত সীমান্ত৷ দেশ-কাল-ভাষার কাঁটাতার পেরিয়ে সঙ্গীত হয়ে ওঠে সার্বজনীন৷ ইয়োহানির কণ্ঠে গাওয়া 'মানিকে মাগে হিতে' গানটা যেন এই বাক্যেরই এক নিখুঁত বিজ্ঞাপন। নইলে কি আর অন্তর্জালে চড়ে সিংহল সাগর পেরিয়ে অচেনা এক ভিনদেশী ভাষায় গাওয়া ইয়োহানির এই গান আমাদের মাথার ভেতর ননস্টপ বাজতে থাকে? 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা