যদিও ইউটিউবের কিছু পলিসি নিয়ে নিয়মিত বিস্তর সমালোচনা হচ্ছে, সামনেও হবে, তাদের কিছু বিষয়ে আরো দায়িত্বশীল হওয়াও দরকার, তবুও এটা স্বীকার করতেই হবে- তারা যেভাবে ষোলো বছর ধরে মানুষের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে,  সে বিবেচনায় তাদের দুয়েকটি খামতি হয়তো উপেক্ষা করাই যায়...

বাংলায় 'জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ' বাগধারাটির সাথে আমরা সবাই-ই কমবেশি পরিচিত। এই বাগধারাটির যদি কোনো চেহারা থাকতো, সে চেহারা অবশ্যই হতো ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম 'ইউটিউব' এর মতন। আক্ষরিক অর্থই বলি কিংবা ভাবানুবাদ, জুতো সেলাই কিংবা চণ্ডীপাঠ...সবকিছুরই তরিকা এখানে উপস্থিত। শুধু এসবই বা কেন, সুঁইয়ে সুতা ঢোকানো থেকে শুরু করে নিউক্লিয়ার সায়েন্স...কী নেই এখানে! জায়ান্ট সার্চ ইঞ্জিন 'গুগল' এর পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম সার্চ ইঞ্জিন যে প্রতিষ্ঠান, তাদের আবিষ্কার যে বিশ্বসভ্যতাকে এগিয়ে দিয়েছে কয়েক ধাপ সামনে, তা হয়তো স্বীকার করে নেওয়াই যায়। 

মানবসভ্যতার জন্যে 'আশীর্বাদ' হিসেবে আসা সেই ইউটিউবের শুরুটা ২০০৫ সালে। সে সময়ে অনলাইন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান- পেপাল এ কাজ করতো তিন তরুণ। অফিসে কাজের সূত্রে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে সখ্যতা, হয় বন্ধুত্ব। তারা অনেকদিন থেকেই ভাবছিলেন, এভাবে ফরমায়েশি কাজ আর পোষাচ্ছে না! কিছু একটা আলাদা করা দরকার। কিন্তু কী করা যাবে? কী করলে মানুষের উপকার হবে এবং তাদেরও স্বস্তি আসবে! একদিন মিটিং এ বসলেন তিন বন্ধু। অনেক কিছুর পরে সিদ্ধান্ত হলো, ভিডিও শেয়ারিং এক প্ল্যাটফর্ম খুলবেন তারা৷ সোশ্যালাইজেশনের মিডিয়াম এবং এন্টারটেইনমেন্ট এর নানাবিধ সুবিধা থাকবে এখানে। এ বিষয়ে জানিয়ে রাখি, তারা অনলাইন ডেটিং অ্যাপ এর মতন কিছু স্টার্টাপের চেষ্টা আগেও চালিয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য, সেগুলো সফল হয়নি।

এই বেলা এই তিন বন্ধুর নাম বলে রাখি। তাদের নাম- চ্যাড হার্লি, স্টিভ চেন এবং জাওয়াদ করিম। জাওয়াদ করিম আবার বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মানুষ! সে হিসেবে এটা বলা হয়তো মোটেও অত্যুক্তি না, শেকড়েবাকড়ে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কিত এক মানুষ যুক্ত ছিলেন ইউটিউবের প্রতিষ্ঠার সাথে! 

ইউটিউবের তিন প্রতিষ্ঠাতা! 

মূল প্রসঙ্গে ফিরি। জাওয়াদ, চ্যাড এবং স্টিভ মিলে শুরু করলেন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ। জাওয়াদ এবং স্টিভ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার এবং চ্যাড ডিজাইনার। তাদের লব্ধ শিক্ষার মিলিত পরিশ্রমে 'ইউটিউব' নামে এক ভিডিও প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করে ২০০৫ এর ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু আত্মপ্রকাশের পরপরই সেখানে কোনো ভিডিও আপলোড করেন না তারা। আগস্ট মাসে ইউটিউবের প্রথম ভিডিও আপলোড করেন জাওয়াদ করিম, 'Me at the zoo' শিরোনামে। যেখানে লাজুক জাওয়াদ 'স্যান ডিয়েগো জাদুঘর' এর খাঁচায় থাকা হাতি দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন। উনিশ সেকেন্ডের এই ভিডিওটিই ইউটিউবের প্রথম ভিডিও! সেই ভিডিও তুমুল সাড়া পায়। ইউটিউবের শুরুর সময় থেকেই নিয়মিত হারে ট্রাফিক বাড়তে থাকে। চ্যাডের মিনিমালিস্ট ইন্টারফেস ডিজাইন, জাওয়াদের প্রোগ্রামিং এবং স্টিভের ট্রাফিক কন্ট্রোল মিলেমিশে প্রথমদিকের চাপ তারা ভালোই সামলাচ্ছিলেন।

ইউটিউবের প্রথম ভিডিও! 

প্রথমদিকে প্রতি দিনে ৩০০০০ ভিউয়ার আসতো সাইটে, এরপর অবস্থা এমন দাঁড়ায়, দুই মিলিয়ন ভিউয়ার আসা শুরু করে প্রতিদিন। এক বছরের মাথায় তারা 'ওয়ান অফ দ্য ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং সাইট' হিসেবে আখ্যায়িত হয়। তখন প্রতিদিন ২০০০০ ভিডিও আপলোড হতো এখানে। এবং ততদিনে সাইটে যুক্ত হয়েছে ২ মিলিয়নেরও বেশি ভিডিও! প্রতিদিন ১০০ মিলিয়ন ভিউয়ার আসছে সাইটে। এত মানুষের চাপ সামাল দেয়া এই উদ্যোক্তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিলো না। কপিরাইটজনিত জটিলতার চাপ বাড়ছিলো। নতুন প্রযুক্তি, উন্নত ইন্টারনেট কানেকশন বা আর্থিক সহায়তা ছাড়া কিভাবে কি করবে, তারা যখন দিশেহারা, তখনই 'গুগল' এর সাথে কোলাবোরেশানে যায় ইউটিউব। গুগলও ততদিনে 'গুগল ভিডিও' নামের এক ইনিশিয়েটিভ নামিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। ইউটিউব'কে কিনে নিয়ে তারা তাদের ব্যর্থতার দায়ভার খানিকটা কমানোরও প্রয়াস পায় যেন।

আস্তে আস্তে ইউটিউবে নানা বিষয়-আশয় যুক্ত হয়৷ প্রথমদিকে ইউটিউবের ভিডিওতে বিজ্ঞাপন থাকতো না৷ পরে টার্গেট অডিয়েন্স ক্যালকুলেট করে সিলেক্টিভ বিজ্ঞাপন দেয়া শুরু হয়। ভিডিওতে লাইক, কমেন্ট করার এবং শেয়ারের ব্যবস্থাও শুরু হয়। বার্ষিক 'ইউটিউব অ্যাওয়ার্ডস' দেয়া শুরু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেটেও ইউটিউবেও দারুণ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত নানা যাচাই-বাছাই চলতে থাকে। 'রিঅ্যাকশন বাটন' নিয়ে গবেষণা, সাইটের লেআউট-কালার-ডিজাইনের রূপান্তর, লাইভ স্ট্রিমিং, অফিশিয়াল প্রিমিয়ার, ইউটিউব টিভি, ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও...অনেককিছুই আসতে থাকে ক্রমশ। এবং মানুষেরও তুমুল সাড়া পায় এই ফিচারগুলো।

এতসব ইতিবাচক দিক থাকা সত্বেও সময়ের ফেরে নানা বিতর্কেও জড়াতে হয় তাদের। তুরস্কে ২০০৮-১০ সাল পর্যন্ত ইউটিউব ব্লক থাকে। কারণ, ইউটিউবের এক ভিডিওতে মোস্তফা কামাল আতার্তুক এবং মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের কিছু বিষয়ে আপত্তিজনক মন্তব্য করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে ইউটিউবের সাথে ব্রিটিশ এক রয়্যালিটি এজেন্সির বিরোধ হয়৷ চায়নার সাথে ইউটিউবের বিরোধ তো সর্বজনবিদিত। অনেকে এও দাবী করেন, ইউটিউবে অটো-রেকমেন্ডেশনে সবসময়েই 'ইতিহাস-বিকৃতি' ও 'প্রোপাগান্ডা থিওরি'র ভিডিও বেশি আসে৷ ছোটদের জন্যে 'ইউটিউব ফিল্টারিং' এর ব্যবস্থা থাকলেও, সে ফিল্টার ভেদ করে মাঝেমধ্যেই অশ্লীল সব ভিডিও বাচ্চাদের ইন্টারফেসে চলে যায়। এগুলো নিয়ে সময়ে-সময়ে নানা বিতর্কের মুখে পড়েছে ইউটিউব।

ইউটিউবের হেডকোয়ার্টার!  

বাংলাদেশে ভিসিডি, ভিসিআর, ডিশলাইন এর পরে ক্রমে ক্রমে যখন ইউটিউব জনপ্রিয় হওয়া শুরু করলো, সময়ের ফেরে এই মাধ্যমটিই হয়ে উঠলো মানুষের বিনোদনের অন্যতম উৎস। খবর, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, ডেইলি সোপ, সিনেমা, নাটক, টকশো... সব চলে এলো মুঠোফোনে, পকেটে। হালকা বিনোদন এবং সিরিয়াস গনমাধ্যমকে 'এক ঘাটের জল' খাওয়ানোর যে প্রচেষ্টা, তাতে পুরোপুরি সফল হলো ইউটিউব। ইউটিউব হলো অনেকের রুটিরুজির উৎসও। বাংলাদেশে 'ইউটিউবার' এর সংখ্যা বেড়েছে ক্রমশ। অনেকের খাওয়া-পড়ার পেশাতেই পরিণত হয়েছেন এই ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবারই অবাধ, নিশ্চিত পদচারণা এখানে।

'ইউটিউব' এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এক সফল প্রতিষ্ঠান। যদিও এখানের সব কন্টেন্ট দেখা যায় বিনামূল্যে, কিন্তু বৈপরীত্য এটাই, এখানে কেউ 'কন্টেন্ট ক্রিয়েটর' হলে ইউটিউব তাকে পারিশ্রমিক দেয়! তাছাড়া ইউটিউবের উপযোগিতা এবং উৎকর্ষতা এতটাই বেশি, এই মাধ্যমটিকে ছাড়া স্বাভাবিক জীবন ভাবাটাও খুব কষ্টের এক বিষয়। যদিও ইউটিউবের কিছু পলিসি নিয়ে নিয়মিত বিস্তর সমালোচনা হচ্ছে, সামনেও হবে, তাদের কিছু বিষয়ে আরো দায়িত্বশীল হওয়াও দরকার, তবুও এটা স্বীকার করতেই হবে- তারা যেভাবে ষোলো বছর ধরে মানুষের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে,  সে বিবেচনায় তাদের দুয়েকটি খামতি হয়তো উপেক্ষা করাই যায়। সে সাথে কৃতজ্ঞ হওয়া যায় 'জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ' এর এই পুরো প্রক্রিয়ায় পাশাপাশি থাকার জন্যেও।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা