আশা রাখি, মুহম্মদ জাফর ইকবালের কালজয়ী সব নির্মাণকে কেন্দ্র করে সিনেমা-সিরিজ বানানোর কথা ভাববেন সংশ্লিষ্টরা। ওটিটির এই গল্প-নির্ভর সময়ে তাঁর বইগুলো যে হতে পারে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না মোটেও। পাশাপাশি এই উপমহাদেশে বরাবরই ব্রাত্য যে শিশুতোষ নির্মাণ, সে সংকট কাটানোর হাতিয়ার হবে প্রিয় এই লেখকের কালজয়ী সব গল্প-উপন্যাস, সেই প্রত্যাশাই রাখি মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের জন্মদিনে। 

তখন সদ্য সদ্য বাংলা-সাহিত্যের সাথে পরিচয় ঘটেছে। গল্পের বই কিংবা কমিকসে ক্রমশ মজে যেতে শুরু করেছি৷ এরকম এক সময়ে হাতে আসে- হাত কাটা রবিন। শুরু থেকেই অদ্ভুত এক সম্মোহন। একটানে পড়ে ফেলি পুরোটা। রবিন, ইবু, নান্টু, হীরা, সলিল...নৌকায় অ্যাডভেঞ্চার, ডাকাতদলের পেছনে ধাওয়া, শুভাপুর গ্রাম, ইসমাইল খাঁ... বায়োস্কোপে একের পর এক দৃশ্য। 'হাত কাটা রবিন' সে বয়সে এতটাই আলোড়িত করেছিলো, বন্ধুবান্ধব মিলে তখন রক্ত-শপথ নিয়ে এক গুপ্ত সংঘও খুলে বসেছিলাম। বিশাল কোনো অ্যাডভেঞ্চারের জন্যে তক্কে তক্কে ছিলাম। শেষপর্যন্ত অ্যাডভেঞ্চারও হয়নি, গুপ্তসংঘও টেকেনি। তবে যা টিকেছে তা- 'হাতকাটা রবিন' এবং এই বইয়ের সাথে আষ্টেপৃষ্টে মিশে থাকা শৈশবের আবছা পেলব স্মৃতি।

বাসায় প্রথম যেদিন ভিসিডি কেনা হয়, সেদিন ভিসিডির সাথে দুটি সিনেমার ক্যাসেটও নিয়ে আসে বাবা। 'হীরক রাজার দেশে' ও 'দীপু নাম্বার টু।' বড় বেলায় এসে 'হীরক রাজার দেশে'র তাৎপর্য বুঝেছি পুরোপুরি। কিন্তু শৈশবের ঐ সময়ে 'দীপু নাম্বার টু' ছিলো চূড়ান্ত মুগ্ধকর। বাবার সাথে দীপুর যাযাবর জীবন, নতুন স্কুলে তারিকের সাথে রেষারেষি, ক্রমশ বন্ধুত্ব, মারামারি-ফুটবল-অ্যাডভেঞ্চার... সব মিলেমিশে অদ্ভুত এক সিনেম্যাটিক এক্সপেরিয়েন্স৷ এখনো যাপিত জীবন নিয়ে নাভিশ্বাস উঠলে 'দীপু নাম্বার টু'র কিছু দৃশ্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখি। হুট করে চলে যাই শৈশবের মেমোরিলেনে৷ স্বস্তি পাই।

শৈশবের এই দুই বিশাল চকমকি পাথর; 'হাত কাটা রবিন' এবং 'দীপু নাম্বার টু' এর যিনি স্রষ্টা, তিনি এই দুই সৃষ্টির বদৌলতেই হয়ে যান খুব পছন্দের একজন মানুষ। তিনি মুহম্মদ জাফর ইকবাল। শৈশবের চোখ এমনিতেও স্বচ্ছ থাকে। সে চোখে 'রঙিন চশমা' পরিয়ে দেয়ার কাজটিই যেন করেন এই শ্বেতশুভ্র চুল-গোঁফের ভদ্রলোক। ক্রমশ পরিচিত হই তার আরো লেখার সাথে৷ রাজু ও আগুনালির ভূত, স্কুলের নাম পথচারী, শান্তা পরিবার, মেকু কাহিনী, টুকুনজিল... প্রিয় সব বইয়ের তালিকা এমন বড়, বলতে শুরু করলে শেষ হবে না যেন৷ 

মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে খুব বেশি কাজ যে হয়েছে বাংলাদেশে, তা বলা যাবে না। অথচ চাইলেই কিন্তু হতে পারতো। তাঁর গল্প, কিশোর উপন্যাস কিংবা সায়েন্স ফিকশন নিয়ে এমন সব সিনেমা-সিরিজ হতে পারতো, যা আমাদের সংস্কৃতিক্ষেত্রের মন্দাভাব কিছুটা হলেও কমাতো। কিন্তু কোনো এক বিশেষ কারণে তা হয়নি। তবে সে আক্ষেপ বাদ রাখি। বরং চোখ রাখি সেসব নির্মাণে, যেসব নির্মাণের উপজীব্য ছিলো মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের বই। 

দীপু নাম্বার টু 

মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস 'দীপু নাম্বার টু' অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলামের এ সিনেমায় একদল কিশোরের দুর্ধর্ষ এক অ্যাডভেঞ্চার যেমন উঠে এসেছিলো, তেমনি বাবার বদলির চাকরীর সূত্রে বছর বছর ঠিকানা পালটানো এক কিশোরের আশ্রয়হীন অসহায়ত্বও উঠে এসেছিলো যুগপৎভাবে। এ সিনেমা নিয়ে আলাদা কিছু বলার ধৃষ্টতা নেই। শৈশবকে রঙিন করার পেছনে যে সিনেমা রেখেছিলো বিশাল বড় প্রভাব, সে সিনেমা নিয়ে আলাদা করে কিছু বলা হয়তো সমীচীনও হবে না৷ 

দীপু নাম্বার টু! 

আমার বন্ধু রাশেদ

নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম যখন মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস অবলম্বনে 'আমার বন্ধু রাশেদ' নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন বেশ নড়েচড়ে বসেছিলাম। 'দীপু নাম্বার টু' এর পরে দ্বিতীয়বারের মতন এই জুটি একত্রিত হচ্ছে, প্রত্যাশার পারদও বেশ ভারী হয়েছিলো। ঠিক সে কারণেই কী না, জানা নেই, সিনেমাটা দেখে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ মেলেনি। খুব যে খারাপ হয়েছে, এমনটা না মোটেও। তবে 'দীপু নাম্বার টু' এর মতন কালজয়ী কিছু হয়নি... এটাই ছিলো আক্ষেপ। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটদের চলচ্চিত্র এমনিতেও কম। 'আমার বন্ধু রাশেদ' সে আক্ষেপ খানিকটা হলেও কমিয়েছে, সেখানেই তৃপ্তি।

আমার বন্ধু রাশেদ! 

প্রেত

মুহম্মদ জাফর ইকবালের ভৌতিক গল্প 'প্রেত' অবলম্বনে আহির আলমের এগারো পর্বের ধারাবাহিক নাটকের শুরু থেকেই ছিলো দারুণ সাসপেন্স। কলেজপড়ুয়া রুমি (আহম্মেদ রুবেল), তার সাথে রহস্যময় কিবরিয়া চৌধুরী (হুমায়ুন ফরিদী)'র মিথস্ক্রিয়া, রহস্য, ব্ল্যাক ম্যাজিক...সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে অনবদ্য যে নির্মাণ, সেটিই 'প্রেত।' তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার মত এ নির্মাণে হুমায়ুন ফরিদীর অভিনয় আলাদাভাবে মুগ্ধ করেছিলো। আহির আলমের নির্মাণের সৌকর্যেও ছিলো বেশ মুন্সিয়ানা৷ 

প্রেত! 

এই নির্মাণগুলো ছাড়াও মুহম্মদ জাফর ইকবালের বই-  কাজলের দিনরাত্রি, আঁখি ও তার বন্ধুরা, ভূতের বাড়ি, হাত কাটা রবিন অবলম্বনেও নির্মিত হয়েছে নাটক, সিনেমা। তার কিশোর উপন্যাস 'রাতুলের রাত রাতুলের দিন' অবলম্বনে 'অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন' নামে এক সিনেমাও মুক্তি পাচ্ছে সামনে।

তবে নির্মাণের সংখ্যা যতই হোক, মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা-নাটক টেলিফিল্মের দিকে তাকালে একটা আক্ষেপ বরাবরই হয়- অযত্নের আক্ষেপ। লেখকের দুর্দান্ত সব গল্পকে যেভাবে অতি-অভিনয় এবং দূর্বল স্ক্রিপ্টের বদান্যতায় মেরে ফেলা হয়েছে একাধিক নির্মাণে, তা দেখে ক্রমশই বিরক্ত, বিব্রত, বিমর্ষ হয়েছি৷ দীপু নাম্বার টু, প্রেত, আমার বন্ধু রাশেদ বাদে বাকি নির্মাণগুলো কোনোটাই ঠিক যেন ততটা দারুণ না, যতটা আমরা প্রত্যাশা করি। তাছাড়া মুহম্মদ জাফর ইকবাল যেসব সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন, তা নিয়েও অনবদ্য সব নির্মাণ হওয়া সম্ভব৷ কেন যেন সেদিকেও দৃষ্টি পড়েনি কোনো নির্মাতার। 

শুভ জন্মদিন, স্যার! 

তবে আশা রাখি, মুহম্মদ জাফর ইকবালের কালজয়ী সব নির্মাণকে কেন্দ্র করে সিনেমা-সিরিজ বানানোর কথা ভাববেন সংশ্লিষ্টরা।  ওটিটির এই গল্প-নির্ভর সময়ে তাঁর বইগুলো যে হতে পারে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না মোটেও। এই উপমহাদেশে বরাবরই ব্রাত্য যে শিশুতোষ নির্মাণ, সে সংকট কাটানোর হাতিয়ার হোক গুণী এই লেখকের কালজয়ী সব গল্প-উপন্যাস, সেই প্রত্যাশাই রাখি মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের জন্মদিনে। 

শুভ জন্মদিন, স্যার। শতায়ু হোন, এই প্রার্থণা করি। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা